সম্পাদকীয়

নির্বাচনে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য গণতন্ত্রের নীরব শত্রু

জাতীয় নির্বাচন গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী পরিবেশে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান-অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার। এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কলুষিত করে না, বরং গণতন্ত্রের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। ডিজিটাল যুগে তথ্য ছড়িয়ে পড়া এখন মুহূর্তের ব্যাপার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সূত্রের মাধ্যমে অসত্য, বিকৃত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেগকে উসকে দেওয়ার জন্য মিথ্যা ছবি, সম্পাদিত ভিডিও বা পুরোনো ঘটনার নতুন ব্যাখ্যা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ ভোটার বিভ্রান্ত হন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত হন এবং কখনও কখনও সামাজিক অস্থিরতাও সৃষ্টি হয়। অপপ্রচার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। নির্বাচন হলো নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও নেতৃত্বের গুণাবলীর প্রতিযোগিতা। সেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ, গুজব বা অসত্য তথ্যের আশ্রয় নেওয়া রাজনৈতিক পরিপক্বতার অভাব নির্দেশ করে। সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা তখনই সম্ভব, যখন বিতর্ক হবে যুক্তিনির্ভর এবং তথ্যভিত্তিক। এই পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাই এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন নির্বাচনী স্বচ্ছতা রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভুয়া খবর শনাক্ত ও প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা এখন নাগরিক দায়িত্বের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের সময় উত্তেজনা থাকবেই; মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে। কিন্তু সেই মতভেদ যদি অসত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। একটি পরিপক্ব জাতি হিসেবে আমাদের প্রয়োজন তথ্যনির্ভর আলোচনা, সহনশীল মনোভাব এবং দায়িত্বশীল আচরণ। সবশেষে বলা যায়, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার নীরব শত্রু। এই শত্রুকে মোকাবিলা করতে হলে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং সাধারণ নাগরিক-সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই হতে পারে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button