খুলনায় তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারীরা অধরাঃ আতংকে নগরবাসী

স্টাফ রিপোর্টারঃ যৌথবাহিনীর কম্বাইন্ড অপারেশন শুরু হলেও বেশিরভাগ সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারী, অপরাধী, চরমপন্থি ও দস্যু গ্রেফতার হয়নি। খুলনা অঞ্চলে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারী ও অপরাধী গ্রেফতার না হওয়ায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিনের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে ভোটারদের মাঝে রয়েছে উদ্বেগ। বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় আছে। শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অনেকে। স্থানীয় ভোটার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সচেতন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অন্ততঃ সাতটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। ফলে প্রায় দিনই অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে। খুনও হচ্ছে। নির্বাচনের আগে থেকে এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ সন্ত্রাসী-অস্ত্রধারী, অপরাধী, চরমপন্থি ও দস্যু গ্রেফতার হয়নি। তাদের গ্রেফতার করতে না পারায় এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে ভোটের দিনের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক ভোটারের মাঝে উদ্বেগ ও শঙ্কা আছে। বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বলছেন, ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে ভয়হীন পরিবেশে নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়। নিরাপত্তা নিয়ে অনেকের মাঝে হতাশা আছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের হুমকির অভিযোগও আছে। ফলে একটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। গত বছরের ৩০ নভেম্বর দুপুরে খুলনায় আদালতের সামনের সড়কে সন্ত্রাসী হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজনকে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই জোড়া হত্যাকা-ের দুদিন আগে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল চরমপন্থি দলের দু’ নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম এবং আরমান ওরফে আরমান শেখ। নগরীতে গতকাল বিকেলে সেনা বাহিনীর নেতৃত্বে মহড়া ছিল চোখে পড়ার মত। দৌলতপুরের আরেক সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নাসিম। আরমান উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে জেল থেকে বের হয়ে আত্মগোপন করে। এরপর থেকে খুলনা অঞ্চলে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর খুলনায় আটটি হত্যাকা- ঘটে। এ ছাড়া গত এক বছরে জেলায় ৫৮টি হত্যাকা- ও অর্ধশতাধিক লাশ উদ্ধার করা হয়। ফলে মানুষের মাঝে ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। খুলনায় এখন সাতটি বাহিনী সক্রিয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, তালাসহ বেশ কিছু এলাকায় চরমপন্থিদের তৎপরতা রয়েছে। কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা এলাকায় বনদস্যুদের দাপট আছে। এখনও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিছু নামমাত্র সন্ত্রাসী অস্ত্রসহ গ্রেফতার হলেও শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীরা গ্রেফতার হয়নি। আবার গ্রেফতারকৃতরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে গত ২৬ জানুয়ারি থেকে খুলনায় অভিযান শুরু হয়। অভিযানের অংশ হিসেবে বিজিবি, র্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ মহড়াও হয়। মহানগরীর শহীদ হাদিস পার্কে জয়েন্ট পেট্রোল অভিযানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নুরুল হাই মোহাম্মাদ আনাছ বলেছিলেন, ‘ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারেন, সেজন্য জনগণের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হবে। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধে এ কার্যক্রম। কোথাও কোন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হলে এই টিম সেখানে গিয়ে কাজ করবে। খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে ২০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেল গঠন করা হয়েছে।’ ভোটের দিনের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনা-২ আসনের প্রার্থী ও খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি বলেন, ‘খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ। গত এক বছরে যে খুনের ঘটনা ঘটেছে, তা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এক বছরে ৫৮টি খুন ও ৫০টির ওপরে লাশ নদীতে পাওয়া গেছে। এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম ও গোয়েন্দা নজরদারি দৃশ্যমান মনে হয়নি। কাজেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অপরাধীদের গ্রেফতার করতে হবে। শক্ত চেকপোস্ট বসাতে হবে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। সেনা ক্যাম্প বাড়াতে হবে। নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নিতে না পারলে ভয়হীন পরিবেশে ভোট দিতে পারবে না মানুষ। কাজেই শঙ্কা রয়েই গেছে।’ইতিমধ্যে খুলনা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে নির্বাচনে চরমপন্থি আতঙ্কের বিষয়টি তুলে ধরেছেন খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া ফুলতলা) আসনে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। নির্বাচনি এলাকায় অবৈধ অস্ত্রধারীদের আনাগোনা এবং চরমপন্থিদের অপতৎপরতার আশঙ্কার কথা পুলিশ সুপারকে জানান তিনি। কিন্তু প্রশাসন কার্যকর কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ায় ৪ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের হুমকি, কালো টাকা বিতরণ এবং সাইবার হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নির্বাচনের বাকি কয়েকদিন। অথচ এখনও প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা হচ্ছে। এভাবে পরিস্থিতি চললে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না।’ এখনও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ কোনও উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন জেলা কমিটির সম্পাদক এড. কুদরত ই খুদা। তিনি বলেন, ‘আগে খুলনায় দু’ দলের মধ্যে সহমত অবস্থানে থাকতো। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন। উভয়দলের মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্খা খুব বেশী। যার জন্য নির্বাচনের বিশৃংখলা হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এ জন্য আইন শৃংখলা বাহিনীকে আরো সর্তক থাকতে হবে। তিনি বলেন, দুখঃজনক হলেও সত্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ৫ আগস্টের পর অবৈধ অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি। এগুলো উদ্ধারও হয়নি। কাজেই ভোটের দিন্ েএসব অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে। সবচেয়ে বেশী ঝুঁকির আসন ১, ৫ও ৬ নং আসন বলে তিনি মনে করেন।এ ব্যাপারে খুলনার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকার বলেন, ‘খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন আগের থেকে ভালো। ইতোমধ্যে পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি। নির্বাচনে সব কেন্দ্রকেই আমরা অধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে অবনতি না ঘটে, সেই দিকেই নজর রাখছি আমরা।’ খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আরও উদ্ধার হলে ভাল হতো। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারে ডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীও কাজ করছে। থানাগুলোর পুলিশও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন তার গতিতে চলবে। এর সঙ্গে সন্ত্রাসী এবং অস্ত্রের ব্যবহারের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে নির্বাচনে যদি কেউ অস্ত্রের ব্যবহার করে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ ভোট ঘিরে মহানগরীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানালেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।’ খুলনা র্যাব-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নিস্তার আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচনের আগে অনেক অস্ত্র ও ককটেল, বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন হত্যাকা-ের পর অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে র্যাব ও পুলিশ। তবে মাদক সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সেগুলো নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়। নির্বাচন ঘিরে বিভাগের আট জেলায় ৬৮টি টহল টিম পরিচালনা করছে র্যাব। রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশে সব কার্যক্রম চলছে। কোনও কেন্দ্র আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’একই কথা বলেছেন কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৮ দিনব্যাপী উপকূলীয় এবং নদী তীরবর্তী দুর্গম ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবে কোস্টগার্ড। এরই ধারাবাহিকতায় কোস্টগার্ড সদস্যরা পশ্চিম জোনের আওতাধীন খুলনা-১, খুলনা-৬ এবং পিরোজপুর-৩ আসনের দাকোপ, কয়রা এবং মঠবাড়িয়া উপজেলার নির্বাচনি এলাকাসমূহের ১৬টি ইউনিয়নের ৬৬টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন। ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকাসমূহে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন নজরদারি, নিয়মিত টহল ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি উৎসবমুখর ভোটের পরিবেশ সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে আমাদের।’ খুলনা ৩নং আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএম আরিফুর রহমান মিঠু বলেন, এ অঞ্চলকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। কিন্তু একজন প্রার্থী ক্ষমতার অপব্যবহার করে আচরণবিধি লংঘন করছেন। প্রতিটি এলাকায় ব্যাপক প্রভাববিস্তার করছেন। এগুলো আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখছে না। যা নির্বাচনের সময় প্রভাব পড়তে পারে।



