সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ অপরিহার্য

সাইবার প্রতারণার ফাঁদ
ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রতারণার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। অনলাইনে পার্টটাইম কাজ, ভিডিও রেটিং বা লাইক-শেয়ার করার মতো সহজ কাজের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। শুরুতে সামান্য অর্থ ফেরত দিয়ে আস্থা তৈরি করা হয়, পরে বিনিয়োগ বা নিরাপত্তা আমানতের নামে সর্বস্ব হাতিয়ে নেওয়া হয়। এই প্রতারণা শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে মানুষকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে তাদের জোর করে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করানো হয়। লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এটি আধুনিক দাসত্বের ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার অপরাধের প্রকোপ বেড়েছে। সিআইডি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বিদেশে। ভুয়া নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে লেনদেন—এসবের মাধ্যমে প্রতারক চক্র তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। ব্যাংক খাতের দুর্বল নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা এই চক্রকে আরও শক্তিশালী করছে। এখন প্রয়োজন সর্বজনীন সচেতনতা। মনে রাখতে হবে, সহজে অনেক টাকা আয় করার কোনো বৈধ পথ নেই। অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা বা অচেনা প্ল্যাটফর্মে অর্থ বিনিয়োগ করা মানেই বিপদ ডেকে আনা। বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি যাচাই করা বাধ্যতামূলক, আর পর্যটন ভিসায় গিয়ে কাজের চেষ্টা করা বিপজ্জনক। ব্যাংকিং খাতেও কঠোর নজরদারি জরুরি। ভুয়া নামে অ্যাকাউন্ট খোলা বন্ধ করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের দায়িত্ব হলো সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন বা প্রস্তাব দেখলে তা এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে রিপোর্ট করা। সাইবার প্রতারণা প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে সচেতন হতে হবে। তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে মানুষ প্রতারণার ফাঁদ চিনতে পারে। একটি অসতর্ক ক্লিক কেড়ে নিতে পারে জীবনের সঞ্চয়। তাই লোভ নয়, নিরাপত্তাই হোক আমাদের অগ্রাধিকার। সচেতনতা, কঠোর নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই পারে এই ভয়ংকর সাইবার প্রতারণার জাল থেকে সমাজকে মুক্ত করতে।
