সম্পাদকীয়

রমজান, বইমেলা ও সংস্কৃতির বাস্তব সংকট

অমর একুশে বইমেলা শুধু একটি বই কেনাবেচার আয়োজন নয়; এটি ভাষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক অনন্য জাতীয় উৎসব। কিন্তু রমজান মাসে বইমেলা আয়োজনকে ‘ব্যবসায়িক আত্মহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে প্রকাশক ঐক্যের পক্ষ থেকে মেলা স্থগিতের দাবি বর্তমান সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে। বিষয়টি আবেগ নয়, বরং নীতিনির্ধারণের যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রকাশকদের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন ব্যস্ততায় গত দুই মাস ছাপাখানাগুলো সৃজনশীল বই উৎপাদন থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। তার ওপর কাগজের দাম বৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক ব্যয় প্রকাশনা শিল্পকে চাপে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে রমজান মাসে, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে এবং পাঠক উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়, তখন বড় পরিসরের বইমেলা আয়োজন করলে প্রকাশকদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রকাশনা শিল্পের বড় অংশ যদি অংশগ্রহণে অনাগ্রহী হয়, তবে মেলার প্রাণবন্ততা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নের মুখে পড়বে। অন্যদিকে, অমর একুশে বইমেলা ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী একটি ঐতিহাসিক আয়োজন। ফেব্রুয়ারি মাসে এর আয়োজন জাতীয় স্মৃতিচর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সময়সূচি পরিবর্তনের প্রশ্নে আবেগ, ঐতিহ্য ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা একটি সংবেদনশীল নীতি ইস্যু। প্রকাশকদের দাবি মানলে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শিল্পের টিকে থাকার প্রশ্ন গুরুত্ব পায়; তবে স্থগিত করলে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও সাংস্কৃতিক প্রতীকের প্রশ্নও উঠে আসে। এই দ্বন্দ্ব আসলে সংস্কৃতি ও অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতার প্রতিফলন। সংস্কৃতির উৎসব টেকসই হতে হলে তা শিল্পী, প্রকাশক ও পাঠকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়; একই সঙ্গে ঐতিহ্যের প্রতীকী গুরুত্বও অক্ষুণœ রাখতে হয়। তাই একটি ‘নামমাত্র’ আয়োজন বনাম পূর্ণাঙ্গ ও অংশগ্রহণমূলক আয়োজন-এই বিতর্ক মূলত সাংস্কৃতিক নীতির গুণগত প্রশ্ন। নতুন সরকারের জন্য এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। প্রকাশকরা যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং জাতীয় উন্নয়নের মৌলিক উপাদান। বই, পাঠ ও প্রকাশনা শিল্প একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই খাত দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সৃজনশীল অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমাধান হতে পারে সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত। সময়সূচিতে সীমিত সমন্বয়, বিকল্প কর্মসূচি, অনলাইন ও হাইব্রিড মেলা, কিংবা পরবর্তী সময়ে বৃহৎ পরিসরের আয়োজন-এসব বিকল্প ভাবা যেতে পারে। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ঐতিহ্য রক্ষা ও শিল্পের টিকে থাকা-উভয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া। অমর একুশে বইমেলা কেবল একটি তারিখ নয়, একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক। সেই প্রতীক যেন অর্থনৈতিক সংকট ও নীতিগত অনমনীয়তার কারণে নিস্তেজ হয়ে না পড়ে-এই দায়িত্ব রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সবার।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button