ক্ষমতায় তারেক রহমান: প্রত্যাশা, চ্যালেঞ্জ ও জাতীয় দায়িত্ব

দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসার দেড় মাসের মাথায় তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ক্ষমতার রূপান্তরের পথ খুলেছে; তবে নতুন নেতৃত্বের সামনে প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জের পরিধি অভূতপূর্ব। তারেক রহমানের ঘোষিত তিন অগ্রাধিকার-আইনের শাসন, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও জাতীয় ঐক্য-তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মৌলিক স্তম্ভ। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিচারবহির্ভূত গুম, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিকীকরণ জনআস্থাকে ক্ষয় করেছে। সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব পুনর্গঠন না হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না। এই সংস্কার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহির কাঠামো দাবি করে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চিত্র জটিল। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, যুব বেকারত্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি জনপ্রিয় হলেও অর্থায়নের উৎস ও টেকসই কাঠামো স্পষ্ট না হলে তা রাজস্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার-এসব উদ্যোগ সম্ভাবনাময় হলেও বাস্তবায়নে দক্ষতা ও নীতি-সমন্বয় জরুরি। বিদেশনীতিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠন করতে হবে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ও সীমান্ত ইস্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক আলোচনা কৌশলগত ভারসাম্য দাবি করে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও বহুমুখী কূটনীতির সমন্বয়ই হবে পরীক্ষার ক্ষেত্র। ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, তরুণ ও শিক্ষার্থীদের বিভক্ত প্রত্যাশা এবং নারীদের অংশগ্রহণের প্রশ্ন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার রক্ষা এবং তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গণতন্ত্রের গুণগত মান নির্ধারণ করবে। নতুন নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত প্রতিশোধপরায়ণতা পরিহার করে জাতীয় পুনর্মিলন। ঐক্যের আহ্বান বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য নিরাপদ গণতান্ত্রিক পরিসর, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতার পরিবর্তন নিজেই লক্ষ্য নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত আস্থা পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি। তারেক রহমানের নেতৃত্বের সাফল্য নির্ভর করবে এই ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তব নীতি ও সংস্কারে রূপ দেওয়ার ওপর-যেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ একসঙ্গে এগোবে।
