সম্পাদকীয়

গণভোটে ‘হ্যাঁ’: সংবিধান সংস্কারের জনসমর্থন, তবে আস্থার প্রশ্ন রয়ে গেল

সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় পড়েছে-এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। তবে ভোটার উপস্থিতি মাত্র ৬০ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ৬৮ শতাংশ সমর্থন-আগের গণভোটগুলোর তুলনায় তুলনামূলক কম-এই ফলাফল জনসমর্থনের পাশাপাশি জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরে। গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারের প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেয়। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করার প্রস্তাব নির্বাহী ক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদি কেন্দ্রীকরণ রোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাংবিধানিক পদে নিয়োগে বহুপক্ষীয় কমিটির বিধান প্রস্তাবিত হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও নিরপেক্ষতা জোরদারে সহায়ক হতে পারে। দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থা ও উচ্চকক্ষের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বও একটি কাঠামোগত পরিবর্তন। এটি ভোটের প্রতিফলন সংসদীয় কাঠামোয় আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভারসাম্য ও পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নে সীমিত ভূমিকা এবং বিল আটকে রাখার সময়সীমা নির্ধারণের বিধান কার্যকারিতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নও উত্থাপন করে। তবে গণভোটের ফলাফলের আরেকটি দিক হলো তুলনামূলক কম ভোটার অংশগ্রহণ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাতিল ভোট। এটি জনসচেতনতা, ভোটপ্রক্রিয়ার জটিলতা এবং রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। সংবিধান সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়ে গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করতে ব্যাপক অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অপরিহার্য। সংসদ নির্বাচনে জয়ী প্রতিনিধিরা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাবেন। কিন্তু এই সংস্কার কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐকমত্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন কেবল কাগজে নয়, চর্চায় প্রতিফলিত না হলে গণতন্ত্রের গুণগত উন্নয়ন সম্ভব নয়। গণভোটের ‘হ্যাঁ’ রায় তাই একটি সুযোগ-ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিষ্ঠানগত নিরপেক্ষতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দিকে এগোনোর সুযোগ। একই সঙ্গে এটি একটি সতর্ক সংকেত-জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়ানো ছাড়া সাংবিধানিক সংস্কারও দীর্ঘস্থায়ী বৈধতা পাবে না। এখন প্রয়োজন সংস্কারকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার না করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন, যাতে সংবিধান সত্যিকার অর্থে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button