একুশে ফেব্রুয়ারি

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে দেশভাগের প্রাক্কালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উর্দুভাষী ড. গিয়াস উদ্দিন আহমদ এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, কংগ্রেস স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দিকে গ্রহণ করার পর স্বাভাবিকভাবেই উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা উচিত। গিয়াস উদ্দিন আহমদের বক্তব্য খ-ন করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা নামে এক নিবন্ধ প্রকাশ করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। নিবন্ধটি আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই। দেশ স্বাধীন ও ভাগ হলো। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কজন অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের উদ্যোগে ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়। বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে সুশীল সমাজের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রফুল্ল কুমার সরকারের ভূমিকা প্রাতঃস্মরণীয়। এই দাবির পক্ষে জনমত সৃষ্টি হলেও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে তা সম্ভব হয়নি। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমদিকে ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে বেশ অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেয়াওত খাঁ ছিলেন অবাঙালি। তিনি অবশ্য রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থক এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন। অধ্যাপক খাঁর ভাষায়, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সারা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন। কাজেই বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ন্যায্য, স্বাভাবিক ও যুক্তিসংগত। ১৯৪৮ সালে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে ভাষা প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের বেশির ভাগ সদস্যই সরকারি প্রস্তাবের ওপর সংশোধনী বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, রাষ্ট্রভাষা সেই ভাষা-ই হওয়া উচিত, বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ যে ভাষা ব্যবহার করেন। যদি ২৯ নং বিধিতে ইংরেজি ভাষা সম্মানজনক স্থান পেতে পারে- পরিষদের কার্যাবলি উর্দু এবং ইংরেজির মাধ্যমে চলতে পারে; তবে বাংলার ৪ কোটি ৪০ লাখ লোকের ভাষা কেন সম্মানজনক স্থান পাবে না? কাজেই এ ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হোক, প্রস্তাবটি সরকারি বেশির ভাগ সদস্যদের বিরোধিতার মুখে অগ্রাহ্য হয়।



