সম্পাদকীয়

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ : জ্বালানি সঙ্কট দূর করুন

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ। কিন্তু দেশের বিদ্যুৎ খাত গভীর সঙ্কটে আবর্তিত। একদিকে পিডিবির বিশাল অঙ্কের লোকসান, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান সিস্টেম লস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চরম স্থবিরতা, সব মিলিয়ে খাতটি এখন অর্থনীতির জন্য একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ছে। সেখানে বর্তমানে দেশে মাত্র ৩-৪ শতাংশ বিদ্যুৎ আসছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ভ্রান্ত বিদ্যুৎনীতির খেসারত দিচ্ছেন দেশবাসী। দলীয় লোকজনকে বিত্তশালী করতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয় শেখ হাসিনার আমলে। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গড়ে উৎপাদন ১২ হাজার মেগাওয়াটের কম; অর্থাৎ অর্ধেক সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে। এর প্রধান কারণ গ্যাসের অভাব, এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতা, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের জ্বালানি সঙ্কট ও ডলার সঙ্কটে জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়া। এ পরিস্থিতিতে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে আছে। বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সঙ্কট মূলত জ্বালানি সঙ্কটের প্রতিফলন। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও জ্বালানি নিশ্চিত না করে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে বাড়ছে ভর্তুকি, চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে। নতুন সরকারের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, স্বল্পমেয়াদে রমজান ও গ্রীষ্মকাল সামাল দেয়া, মধ্যমেয়াদে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নীতি প্রণয়ন। এ তিন স্তরের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে সঙ্কট উত্তরণ সম্ভব নয়। বিদ্যুৎতের প্রধান কাঁচামাল গ্যাস। দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা এখন ৩৮০-৪০০ কোটি ঘনফুট; অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি পূরণে উচ্চ দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপে প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এদিকে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬-১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার একদিন পর এসেছে রমজান। সেই সাথে এখন আসছে গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। আবার রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহও জরুরি। বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রমজানে সাহরি ও ইফতারের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন।
কিন্তু সরকার নির্দেশ দিলেও জ্বালানির অপ্রতুলতায় লোডশেডিং পুরোপুরি এড়ানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্ব^ল্পসময়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হবে। বড় গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ সীমিত করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্রাধিকার দেয়া, ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করতে হবে। আমরা মনে করি, বিদ্যুৎ খাত টেকসই করার মূল উপায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌর, বায়ু) ব্যবহার বাড়ানো, সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ চুরি রোধ এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া। এছাড়া, ক্যাপাসিটি চার্জ বা অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button