সুন্দরবনে জলদস্যু-বনদস্যু দমনে শুরু করা হয়েছে কম্বিং অপারেশন

# অপহৃত ২০ জেলে উদ্ধার হয়নি #
আজাদুল হক, বাগেরহাট ।
চব্বিশের ৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের পর সুন্দরবনে চরমভাবে বেড়ে যাওয়া জলদস্যু-বনদস্যুতা দমনে শুরু করা হয়েছে কম্বিং অপারেশন। গত মঙ্গলবার থেকে শুরু করা এ অভিযানে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সাথে নৌবাহিনী, র্যাব, নৌ-পুলিশ, পুলিশ ও বন বিভাগ অংশ নিয়েছে। সুন্দরবন বনদস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। এদিকে কম্বিং অভিযান চললেও সম্প্রতি মুক্তিপনের দাবীতে অপহ্নত ২০ জেলের এখনো মুক্তি মেলেনি । এসব জেলেরা কি অবস্থায় আছে তারও সঠিক তথ্য জানতে পারেননি মহাজন ও তাদের পরিবার। মহাজনরা জানিয়েছেন, জিম্মি জেলেদের মুক্তিপণ হিসেবে জনপ্রতি সাড়ে তিন লাখ টাকা করে দাবি করেছে বনদস্যুরা। দস্যুদের দাবিকৃত চাঁদার টাকা পরিশোধ না করলে জিম্মিদের ভাগ্যে করুণ পরিনতি নেমে আসবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে প্রচ- চাপ ও শঙ্কায় পড়েছেন মহাজনরা। গত সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন উপকুলের নারিকেলবাড়িয়া ও আমবাড়িয়া এলাকায় মৎস্য আহরণকালে ২০টি ট্রলার থেকে ২০ জেলেকে তুলে নিয়ে যায় বন ও জলদস্যু সুমন এবং জাহাঙ্গীর বাহিনীর স্ব^শস্ত্র দস্যুরা। অপহৃত জেলেরা পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি উৎপাদন পল্লীর আলোরকোল ও নারকেলবাড়িয়া শুঁটকি পল্লীর জেলে। জেলে মহাজন ও বন বিভাগ সুত্রে গত দেড় বছরে অন্তত ২০টি বনদস্যু জলদস্যু বাহিনীর উত্থান ঘটেছে। সুন্দরবন হয়ে ওঠে এসব দস্যু বাহিনী নিরাপদ আশ্রয় স্থল। সম্প্রতি এসব বন ও জলদস্যু বাহিনীর দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে জেলে ও ব্যবসায়ীরা। উদ্বেগ দেখা দেয় বনবিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে গত মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে শুরু হয় যৌথ অভিযান (কম্বিং অপারেশন)। এ অভিযানে কোস্টগার্ডের সাথে রয়েছে নৌবাহিনী, র্যাব, নৌপুলিশ, পুলিশ ও বন বিভাগ। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড। এর আগে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার প্রশাসনের সঙ্গে গত রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) খুলনা সার্কিট হাউসে জরুরী বৈঠক করেন সরকারের পরিবশে, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমা-ার সিয়াম-উল-হক জানান, সম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় জেলে-মহাজনরা অসহায় হয়ে পড়েন। বিষয়টি খোদ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দেয়। সরকারের নির্দেশে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে নৌবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান শুরু করা হয়েছে। দস্যু নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলমান থাকবে। সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি পল্লীর মহাজন জাকির শেখ, আব্দুর রউফ মেম্বর ও পঙ্কজ বিশ^াস জানান, দস্যুদের কারণে জেলেরা সাগর ও সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুধুমাত্র দিনের বেলা মাছ ধরছেন জেলেরা। অপহ্ন ২০ জেলে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। শুনেছি যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অভিযানের কোনো সুফল দেখছিনা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ বলেন, ৫ আগস্টে দেশের পট পরিবর্তনের পর সুন্দরবনে দস্যুদের আধিপত্য বেড়ে গেছে। সুন্দরবন সেই পূর্বের ভয়াবহ অবস্থায় ফিরেছে। বনজীবীরা বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরাও আছেন আতঙ্কে। এমন পরিস্থিতিতে উপকূলের অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। চলমান যৌথ অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাক ঢোল পিটিয়ে দস্যু দমন করা যায় না। বর্তমানে যেভাবে যৌথ অভিযান চলছে তাতে শুধু মহড়াই মনে হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে দস্যু নির্মুল করতে হলে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। এভাবে হুইসেল বাজিয়ে শুটিং করে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয় না। পূর্বে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করতে যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল সেই পদ্ধতিতে অভিযান পরিচলনা করলে সফলতা আসতে পারে। সরকারের পরিবশে, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা হবে। দস্যুদমনের বিষয়ে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গেও আলাপ হয়েছে। স্বরাস্ট্র মন্ত্রী এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতার আশ^াস দিয়েছেন। জেলে ও বনজীবীদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।



