শুধু ফেব্রুয়ারিতেই বেড়েছে ৪০ শতাংশ মশা

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ দিনের বেলায় ঘুম বা বিশ্রামে ব্যাঘাত। এসব মশার কামড়ের কারণে চুলকানি, ত্বকের জ্বালা ও অস্বস্তি বেড়ে যায়। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বড় সমস্যা হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি। কিউলেক্স মশা নানা রোগের বাহক, যেমন নেউফ্লামাইটিস ও অন্যান্য মশাবাহিত সংক্রমণ। শহরের জলাবদ্ধতা ও আবর্জনায় এই মশা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ফলে রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শ্যামপুর, ধানমন্ডি, রায়েরবাজার ও উত্তরাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বাসিন্দারা মশার তীব্র উৎপাতের কথা জানিয়েছেন। অনেক স্থানে নালা-নর্দমা ময়লা ও আবর্জনায় আটকে থাকায় সেখানে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল ফগিং কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মশার লার্ভা ধ্বংসের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। সরেজমিনে রাজধানীর এসব এলাকায় নর্দমা ও খালের জলাবদ্ধতা চোখে পড়ে। ছোট ছোট খালগুলো ময়লা, আবর্জনা ও কচুরিপানায় ভর্তি। কিছু কিছু রাস্তার ধারে পানি জমে ছোট ছোট নালা তৈরি হয়েছে। এসবই মশার প্রজননের প্রধান স্থান। স্থানীয় বাসিন্দারা রাতের বেলা বাইরে বের হওয়ায় বিরক্তি প্রকাশ করছেন। বস্তি এলাকা, ছোট গলিপথ, আবাসিক রোড; সব জায়গায় মশার ঘনত্ব দেখা যাচ্ছে। কেউ ঘরের বারান্দায় বসলেও মশা ঢুকে যাচ্ছে। নালা বা ড্রেনের পাশে পানি জমে থাকায় ছোট শিশু ও বৃদ্ধরা বাইরে বের হতে দ্বিধা করছে। অনেক ঘরে মশারি ব্যবহার করলেও সেটি কার্যকর হচ্ছে না। শহরের হালকা বাতাসে মশার উড়ে বেড়ানোও স্পষ্ট। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাতেও রাজধানীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন মিলেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় মশার উপদ্রব কেবল বাড়ছেই না, অনেক এলাকায় তা ইতোমধ্যে ভয়াবহ মাত্রা স্পর্শ করেছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন বিভিন্ন এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হাতিরঝিল, গুলশান-বনানী লেকপাড়, উত্তরা, বিমানবন্দর এলাকা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় মশার ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্ন নর্দমা এবং দূষিত পানির আধিক্য মশার বংশবিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। ফলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নগরবাসীর জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে। হাতিরঝিল লেকপাড়ের ময়লা-আবর্জনা থাকায় সেখানেও মশার বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে। উত্তরা ও বিমানবন্দর এলাকার ছোট খালগুলোও আবর্জনায় বন্ধ হয়ে গেছে। পানির প্রবাহ নেই, ফলে মশার বিকাশ হচ্ছে ব্যাপক। উত্তরখান, দক্ষিণখান ও মিরপুরের গলিপথেও তেমনই অবস্থা; নালা-নর্দমা ময়লা ও আবর্জনায় ভরা। বসতবাড়ির বারান্দা বা ছাদেও মশার উৎপাত দেখা যাচ্ছে। মোহাম্মদপুর এলাকার রেস্টুরেন্ট মালিক মো. মিলন মিয়া বলেন, কিছুদিন আগেও সন্ধ্যার পর থেকেই মশার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। দিন-রাত সব সময়ই মশার উৎপাত দেখা যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টে বসে খাবার খাওয়ার সময় মশার কারণে ক্রেতারা প্রায়ই বিরক্ত হন। ফলে মশা তাড়াতে সব সময়ই বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আগে মূলত সন্ধ্যার পর মশা বেশি দেখা যেত। এখন দিনের বেলাতেও মশা ঘুরে বেড়ায়। এ কারণে রেস্টুরেন্টে আসা অনেক ক্রেতাই অভিযোগ করছেন। মশার এই অব্যাহত উৎপাত ব্যবসার পরিবেশকেও অস্বস্তিকর করে তুলছে বলে তিনি জানান। মাত্র তিন মাস আগে তিনি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী তানভীর আলম। সাত দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছে তাকে। একপর্যায়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছি। তবে, এখনো মশার উৎপাত তাকে ভীষণভাবে আতঙ্কিত করে। কোথাও গিয়ে স্বস্তিতে বসার সুযোগ নেই; মনে হয় চারপাশে যেন মশার ঝাঁক অপেক্ষা করছে। এমনকি মশারির ভেতরেও মশা ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটছে। তার আশঙ্কা, পরিস্থিতি এমন থাকলে আবারও যেকোনো সময় মশাবাহিত কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করছে। পুরো নগরজুড়ে ফগিং বা স্প্রে করা ইন্সেক্টিসাইড প্রয়োগ করা হয়, যা পূর্ণবয়স্ক মশা নাশ করতে কার্যকর। পাশাপাশি লার্ভাসাইড ব্যবহার করে জলাশয়, নর্দমা ও ড্রেনে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংস করা হয়। ছোট জলাশয় বা বন্ধ পানির জন্য ব্রিটল ও অন্যান্য রাসায়নিক ট্যাবলেটও প্রয়োগ করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিভিন্ন এলাকার মশা নিধন কর্মীরা জানান, নিয়মিত ওষুধ ছিটালেও প্রত্যাশিত ফল মিলছে না। এর প্রধান কারণ কিউলেক্স মশার মূল প্রজননস্থল ময়লা-আবর্জনায় ভরা নর্দমা ও আবদ্ধ পানি। এসব স্থানে কার্যকরভাবে ওষুধ পৌঁছানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তারা জানান, অনেক জায়গায় ড্রেনে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে আছে। ফলে ড্রেনের ভেতরের আবদ্ধ অংশে ওষুধ পৌঁছানোর সুযোগ থাকে না। এ কারণে মশার লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছে না এবং সেখান থেকেই দ্রুত মশার বিস্তার ঘটছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ড্রেন পরিষ্কার ও বর্জ্য অপসারণ না করলে শুধু ওষুধ প্রয়োগ করে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণ করা এখন সিটি করপোরেশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্চ মাস এলেই সাধারণত কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়ে যায় এবং এর পরপরই ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়তে শুরু করে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিটি করপোরেশনকে বাড়তি সতর্কতা নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং মশা নিধন কর্মীরা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নগরের খাল খনন, নর্দমা ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ দ্রুত শুরু করার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রশাসক আরও বলেন, রাজধানীর অনেক এলাকায় নর্দমা ও ড্রেন এমনভাবে ময়লা-আবর্জনায় জমাট বেঁধে আছে যে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয় এবং সেই জমে থাকা পানিই মশার বংশবিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করছে। তার মতে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত না করা গেলে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও (ডিএসসিসি) মশা নিধন কার্যক্রম চলমান। তবে নগরবাসী এখনও প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছেন না। করপোরেশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত কাজ চললেও মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানো শুধুমাত্র পূর্ণবয়স্ক মশা কমাতে কিছুটা কার্যকর, কিন্তু লার্ভা ধ্বংস এবং দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত, বছরব্যাপী পরিকল্পনা প্রয়োজন। ডিএসসিসি সূত্র জানিয়েছে, দক্ষিণ সিটিতে একাধিকবার প্রশাসক পরিবর্তন হলেও নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় তদারকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় মশা নিধনের কাজে নিয়োজিত কিছু কর্মী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দায়িত্বে উদাসীনতার অভিযোগও রয়েছে। বর্তমানে এই কাজে এক হাজার ৩০ জন কর্মী নিয়োজিত। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে সাতজন এবং বিকেলে ছয়জন কর্মী মশার ওষুধ ছিটানোর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মশার উৎপাতকে নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে এই প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। নাগরিকরা যদি সচেতন না হন এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে না সহায়তা করেন, তবে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। প্রশাসক জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে অঞ্চলভিত্তিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে, যা মশার বংশবিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। শুধু ওষুধ ছিটানো নয়, নাগরিক সচেতনতা ও প্রজননস্থল ধ্বংস মিলিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে নগরে মশার ভয়াবহ উৎপাত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ বিষয়ে অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, মার্চ মাসে মশার উৎপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল এবং মাসের শুরুতেই তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষের সঠিক পদক্ষেপ এবং নাগরিকদের সচেতনতা থাকলেই এই ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। অধ্যাপক বাশার আরও বলেন, নতুন রাজনৈতিক প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ায় আশা করা যায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় সমন্বয় ও তদারকিতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এখন নগরে মশার বিস্তার রোধ করতে দ্রুত ড্রেন, নর্দমা এবং ডোবাগুলো পরিষ্কার করা ছাড়া বিকল্প নেই। এসব কাজ ছাড়া নগরে মশার ভয়াবহ উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।



