জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর তিন সপ্তাহ ধরে শুধু ইরান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য জ্বলছে। যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে জ্বালানি তেলও। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এই যুদ্ধের প্রভাব ক্রমে গোটা বিশ্বকেই দুর্ভাবনায় ফেলেছে। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। এভিয়েশন খাতে রীতিমতো ধস নামছে। বাংলাদেশেও তার প্রভাব ক্রমেই চরম রূপ নিচ্ছে। জ্বালানিসংকট, মূল্যস্ফীতি ছাড়াও রপ্তানি আয়, প্রবাস আয়ে ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা হয়। এসব আমদানি ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে বাজারে। যুদ্ধের আগে থেকেই আমাদের গ্যাসসংকট প্রবল আকার ধারণ করেছিল। অনেক শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল। এলএনজির সরবরাহ ব্যাহত হলে সেই সংকট আরো তীব্র হবে। গ্যাসের অভাবে অনেক সার কারখানা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। আমাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি বড় অংশই আসে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। ডিজেল ও বিদ্যুতের অভাবে সেচের সংকট হতে পারে। আবার সার ও সেচের সংকট হলে কৃষি উৎপাদনেও তার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে গম, ডাল, চিনিসহ অনেক খাদ্যপণ্যের আমদানি ব্যাহত হতে পারে। সরবরাহ ব্যাহত হলে সিন্ডিকেট ও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বাজার অস্থির করার চেষ্টা চালাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যাবে। ব্লুমবার্গেে তথ্যে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে গতকাল প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল প্রায় ১০৫ মার্কিন ডলার। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যখন ৭০ ডলারের নিচে ছিল, তখন বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের যে দাম নির্ধারিত হয়েছিল, এখন পর্যন্ত সেই দামেই তেল বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এমন ভর্তুকি বেশিদিন বহন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে সঙ্গে সঙ্গে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাবে। বাড়বে পণ্যের মূল্যও।
গত রবিবার রাজধানীতে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ ও ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধের কারণে বেশ কিছু আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, রপ্তানি বাজার ও প্রবাস আয়ের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন সংকট মোকাবেলায় জরুরি নীতি, কৌশল ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে সমন্বিত উদ্যোগ। ব্যবসায়ীদের সংকটগুলো বুঝতে হবে। শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনে কী ধরনের সংকট হচ্ছে জানতে হবে। কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা দেখতে হবে। এ জন্য স্টেকহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্বসহ একটি জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠন অত্যন্ত জরুরি। আমরা আশা করি, সরকার বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে এবং বাংলাদেশ দ্রুতই এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।
