মতিঝিলে চোর-পুলিশ খেলা, গুলিস্তানে পুলিশের সামনে নতুন নোট বিক্রি

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এবার নতুন নোট ছাড়েনি বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ঈদের সালামি ও উপহারের জন্য নতুন টাকার খোঁজে বাধ্য হয়ে ফুটপাতে ছুটছেন সাধারণ মানুষ। এই সুযোগে ১০০ টাকার একটি বান্ডিল কিনতেই ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এই অবৈধ বেচাকেনা ঠেকাতে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক এলাকায় বিক্রেতাদের সঙ্গে পুলিশের ‘চোর-পুলিশ খেলা’ চললেও গুলিস্তানে খোদ পুলিশের সামনেই প্রকাশ্যে চলছে নতুন নোটের পসরা। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টা। ঢাকার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল অনেকটাই শান্ত। সড়কে মানুষের আনাগোনা কম, যানবাহনও হাতে গোনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের বটতলায় ফুটপাতে ছেঁড়া টাকার বেচাকেনার অস্থায়ী দোকান নিয়ে বসে আছেন ষাটোর্ধ্ব দুই ব্যক্তি। তাদের পাশ ঘেঁষে বসে আছেন আরও দুজন। তাদের সঙ্গে একটি করে ব্যাগ। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সেখানে মোটরসাইকেল নিয়ে দুজন ব্যক্তির আগমন। তারা ছেঁড়া টাকার এক বিক্রেতার কাছে জানতে চান, নতুন টাকার নোটের দোকানগুলো নেই কেন? এ সময় ব্যাগ নিয়ে বসে থাকা দুই ব্যক্তি বলতে লাগলেন, ‘লাগবে কত বলেন।’ ক্রেতা তার চাহিদামতো টাকা চাইতেই একজন ব্যাগ খুলে নতুন টাকা বের করলেন। তার ব্যাগভর্তি নতুন টাকা। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ফটকের সামনে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে দেখা গেল। তাদের দেখে টাকা বিক্রি না করেই ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে পালান একজন। কিছুদূর গিয়ে ক্রেতাকে তার কাছে যেতে বলেন। সেখানেই দরদাম হলো, বিকিকিনিও হলো। আরও কয়েকজন ক্রেতা দরদাম করে নতুন টাকা কিনলেন। মোহাম্মদ স্বপন নামের এই বিক্রেতা বলেন, ‘ঈদে নতুন টাকার কদর থাকে। ব্যাংকও নতুন টাকা দিচ্ছে না। মানুষ আমাদের কাছে যা পায় কিনে নেয়। কিন্তু পুলিশের জ্বালায় ঠিকমতো বসতে পারি না। একটু পরপর দৌড়ানি দেয়। দুই ঘণ্টায় ৫ হাজার টাকার মতো বিক্রি করছি। টাকার রেট বেশি। ব্যাংকও বন্ধ হয়ে যাবে। কাল থেকে টাকার রেট আরও বেশি হবে।’ স্বপনের দেওয়া তথ্যমতে, পুরোনো নকশার ২ টাকার নতুন এক বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দামে। ১০ টাকার পুরোনো নকশার নোট বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বাড়তি দামে; আর নতুন নকশার নোটে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এ ছাড়া ২০ টাকার নতুন নকশার নোট ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ও পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। ৫০ টাকার নতুন নকশার নোট ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা ও পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। আর ১০০ টাকার নতুন নকশার নোট ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা ও পুরোনো নকশার নোট ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে গুলিস্তানে স্পোর্টস মার্কেটের সামনের ফুটপাতে চিত্র একেবারে ভিন্ন। নতুন নোট পণ্য হিসেবে বাজারে বিক্রি বেআইনি হলেও সেখানে পুলিশের সামনেই নতুন নোটের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। ঈদের সালামি ও উপহার দেওয়ার জন্য অনেকেই নতুন নোট কিনতে ভিড় করছেন। বিক্রেতারা বিভিন্ন অঙ্কের নতুন নোট সাজিয়ে ফুটপাতে বিক্রি করছেন। বিশেষ করে ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নোটের চাহিদা বেশি। এসব অঙ্কের নতুন ও পুরোনো নকশার বান্ডিল পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্রেতা নতুন নকশার নোটের জন্য কিছুটা বাড়তি দাম হাঁকাচ্ছেন। ক্রেতাদেরও নতুন নকশার নোটের ওপর চাহিদা বেশি। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, এখানে পুরোনো নকশার ২ টাকার নতুন এক বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা বাড়তি দামে। ৫ টাকার নতুন এক বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা বাড়তি দামে। ১০ টাকার পুরোনো নকশার নোট বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা বাড়তি দামে; আর নতুন নকশার নোটে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৪৫০ টাকা। এছাড়া ২০ টাকার নতুন নকশার নোট ৩৫০ ও পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল ৩০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। ৫০ টাকার নতুন নকশার নোট ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা ও পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। আর ১০০ টাকার নতুন নকশার নোটের বান্ডিল ৫০০ টাকা ও পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল ৪৫০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। নতুন নোট কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, ব্যাংকে গিয়ে নতুন নোট পাননি তারা। সে জন্য ফুটপাতই তাদের ভরসা। তবে বিক্রেতারা অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা।মো. জুবায়ের তার ছোট বোনকে নিয়ে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছেন। গুলিস্তান থেকে তিনি বাসে উঠবেন। বাসে চড়ার আগে নতুন নোট কিনতে গুলিস্তানে স্পোর্টস মার্কেটের সামনের ফুটপাতে আসেন তিনি। জুবায়ের বলেন, ‘ব্যাংকে গিয়ে নতুন নোট পাইনি। বাধ্য হয়ে ফুটপাতে আসতে হয়েছে। প্রচুর মানুষের ভিড় ঠেলে নতুন নোট নিলাম। হাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি দিয়ে নতুন টাকা নিতে হলো।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি এ ধরনের কাজে জড়িত থাকেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে যদি নতুন নোট বিক্রির জন্য সরবরাহ করা হয়, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



