জ্বালানী নিয়ে জনমনে আস্থা ফেরাতে হবে

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট সংকট কিছুতেই কাটছে না, বরং দিন যত যাচ্ছে সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। রাজধানীজুড়ে তেলের পাম্পে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন প্রায় স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এমনকি বন্ধ পাম্পেও গ্রাহকরা লাইন দিয়ে প্রহর গুনছেন কখন তেল আসবে। কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী পর্যন্ত মোতায়েন করতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে আশ্বাসবাণী এসেছে, জ্বালানি তেলের এক মাসের মজুদ আছে, আরো কেনা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, সরকারের উচ্চমহল থেকে আশ্বাসবাণী পেলে চলমান অস্থিরতা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে। প্রবাহে গত সংখ্যায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত মঙ্গলবার জরুরি বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি বলেছেন, ‘এর আগে সাধারণত ১৫ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকত। এখন পর্যন্ত আমাদের এক মাসের মজুদ রয়েছে।’ পরে তিনি বলেন, এখন অনেকে আতঙ্কিত হয়ে (প্যানিক বায়িং) বেশি তেল কিনছেন। এতে তেলের অপচয় হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিশ্লেষকরাও জানিয়েছেন, চলমান সংকট মূলত আমদানি ঘাটতির কারণে নয়, বরং পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার ফল। আমরা মনে করি, চলমান সংকট কাটাতে এসব ক্ষেত্রে সরকারকে আরো দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের শুরু থেকেই সরকার বলে আসছে, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। সাশ্রয়ী কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, সরবরাহের অভাবে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরো নাজুক হবে। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে রাজধানীর বেশ কিছু জায়গার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় সবখানে একই হাহাকার। কোথাও কোথাও ‘বন্ধ’ বা ‘অকটেন নাই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, (মঙ্গলবার) সকাল থেকে তিনটি পাম্প ঘুরে একটিতেও তেল সংগ্রহ করতে পারেননি। শুধু তা-ই নয়, জ্বালানির অভাবে নানা খাতে এরই মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানায় চাকা ঘুরছে না। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চলতি বোরো মৌসুম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কাজেই চলমান সংকট নিরসনে শুধু পর্যাপ্ত মজুদ আছে বললেই হবে না, পাশাপাশি অব্যবস্থাপনা কাটাতে সরকারকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞমহল দীর্ঘদিন থেকে দেশের জ্বালানি মজুদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে আসছে। প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় আমাদের মজুদ সক্ষমতা অনেক কম। কিন্তু বিগত কোনো সরকারই জরুরি এই বিষয়ে মনোযোগ দেয়নি। এ কারণে যুদ্ধ পরিস্থিতি ছাড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরবরাহে সংকট দেখা দিলে আমাদের বড় ধরনের অনিশ্চতায় পড়তে হয়। কাজেই এই সরকারের উচিত মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া। আমাদের জ্বালানি খাত প্রায় পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। সেখানকার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জনমনে উদ্বেগ দেখা দেবে, তা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু হুলুস্থুল-বিশৃঙ্খল-উত্তেজনার কারণে সংকট কাটে না, বরং গভীর হয়। আমরা মনে করি, চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও সক্রিয় হতে হবে। জনমনে আস্থা ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থপনার বিকল্প নেই।
