স্থানীয় সংবাদ

বিয়েতে কনেপক্ষ বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক

# তানজিয়ার জীবনে নতুন আশার আলো #

এম সাইফুল ইসলাম ঃ যে শিশুটি একদিন রেলস্টেশনে হারিয়ে গিয়েছিল, আজ সেই তানজিয়া নতুন সংসারের পথে হাঁটছে। চোখে-মুখে তার স্বপ্নের আলো, কিন্তু বুকের গভীরে লুকিয়ে আছে শূন্যতার দীর্ঘ ইতিহাস। তবুও আজ তার জীবনে ফিরে এসেছে এক নতুন সকাল যেখানে অভিভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র, আর আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছে তার পরিবারের প্রতীক।
পরিবার হারিয়ে ছোটবেলায় আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া তানজিয়ার জীবনে এসেছে নতুন আশার আলো। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা তানজিয়ার বিয়ে শুক্রবার সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার তার গায়ে হলুদ ও আইবুড়ো অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজনটি পরিণত হয় এক আবেগঘন মানবিক মিলনমেলায়।
বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মোঃ মোখতার হোসেন, জেলা প্রশাসক আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকার, খুলনা বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক অনিন্দিতা রায়, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক কানিজ মোস্তফা, জেলা ক্রীড়া সংস্থার এডহক কমিটির সাবেক সদস্য সাংবাদিক এম সাইফুল ইসলাম, কারাতে ফেডারেশনের সাবেক সদস্য মোহাম্মাদ আলী। অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপপ্রকল্প পরিচালক বিপ্লব কুমার সাহা। তানজিয়া যখন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয় তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। সৈয়দপুর রেলস্টেশনে এক ব্যক্তির মাধ্যমে সে থানা পুলিশের সহায়তায় জিডিমূলে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, রংপুরে আশ্রয় পায়। পরে তানজিয়া তার বাড়ি খুলনার করমচা বলে জানালে ২০২০ সালে তাকে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র খুলনায় রেফার করা হয়। কিন্তু পরিবার খুঁজে পাওয়ার সেই প্রতীক্ষা আর শেষ হয়নি। বর্তমানে তানজিয়ার বয়স ১৮ বছরের বেশি।
কেন্দ্র সূত্র জানায়, তানজিয়ার পরিবারের সন্ধানে ধারাবাহিক কাউন্সিলিং, অনুসন্ধান, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন এবং জাতীয় শিশু সহায়তা সেবা ১০৯৮-এর সহায়তা নেওয়া হলেও তার পরিবারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরিবারহীন তানজিয়ার জীবনে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র খুলনা হয়ে ওঠে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। সেখানে তাকে দেওয়া হয় জীবনদক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, দর্জি কাজ, সূচ-সুতা ও এমব্রয়ডারি প্রশিক্ষণ। শুরুতে তার আচরণে আগ্রাসী মনোভাব দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে। সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের উপপ্রকল্প পরিচালক বিপ্লব কুমার সাহা জানান, পরিবার না থাকলেও তানজিয়ার জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাষ্ট্রই তার অভিভাবক হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন খুলনা, ও জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর খুলনা এবং সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র খুলনা যৌথভাবে তার বিবাহ আয়োজন সম্পন্ন করে। বিয়ের অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকসহ সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক, উপ-পরিচালক এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের উপস্থিতি যেন প্রমাণ করল রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানবতার সম্পর্ক অনেক গভীর। খুলনা বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক অনিন্দিতা রায় জানান, তানজিয়া আমাদের কাছে শুধু একজন আশ্রিত শিশু নয়, সে আমাদের পরিবারেরই একজন সদস্য। আমরা চেষ্টা করেছি যেন তার জীবনের এই বিশেষ দিনে কোনো অভাব না থাকে।” অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “রাষ্ট্র যখন এমনভাবে দায়িত্ব নেয়, তখন মানবতার জয় হয়।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button