সম্পাদকীয়

পদক্ষেপ নিতে হবে

# মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব #

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত, রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় বড় ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বেশ কিছুদিন থেকে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সংকট সামাল দিতে সরকারের তরফ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এদিকে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর সরাসরি ধাক্কা লাগবে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে। প্রবাহে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বার্ষিক ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকটাই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান ও কুয়েতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরাই এই আয়ের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলের শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনেক শ্রমিক আটকা পড়েছেন। কাজেই যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এই খাতে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। তাই এই খাত সুরক্ষায় সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে ক্ষয়ক্ষতি সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে। সরকারকে এ ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের শুরু থেকেই সরকার বলে আসছে, জ্বালানি মজুদ পর্যাপ্ত রয়েছে, আরো আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তরফ থেকেও একই ধরনের আশ্বাস এসেছে। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে হাহাকার কিছুতেই কমছে না। প্রায় সব পাম্পে শুধু ‘নাই, আর নাই’। গতকাল কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, চলমান সংকট মোকাবেলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। তবে আমরা মনে করি, জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি এই খাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান সংকট মূলত আমদানি ঘাটতির কারণে নয়, বরং পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার ফল। এ কারণে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা দূর করতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা রোধ করতে হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রশ্ন তুলেছেন, দুই দিনের তেল দুই ঘণ্টায় শেষ হয় কী করে? অর্থাৎ আগে যে পরিমাণ তেল দিয়ে দুই দিন চলত, সেই পরিমাণ তেল এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হচ্ছে। এটা ঠিক যে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে বেশি তেল ক্রয় করছেন। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আরো সংযমী হওয়া দরকার। একটি বৈশ্বিক সংকট চলছে, এর মধ্যে সবাই যদি হুলুস্থুল করে তেলের পাম্পে হামলে পড়ি, তাহলে সংকট বাড়বে বৈ কমবে না। জ্বালানিসংকট কাটাতে একটি ইতিবাচক খবর পাওয়া গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশসহ ছয় দেশের জাহাজে বিশেষ নিরাপত্তা দেবে তেহরান। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ, ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান ও ইরাকের জাহাজ টার্গেট না করার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের চলমান সংকট হয়তো বেশিদিন থাকবে না। এ ব্যাপারে সরকারকে এখনই তৎপর হতে হবে। আমরা জানি, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির ওপর সরকারের হাত নেই, কিন্তু আপৎকালীন সংকট মোকাবেলায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেমনÍমধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করা প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে দেখভাল করা; বিভিন্ন দেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো। একই সঙ্গে এই প্রস্তুতি রাখা, যেন উত্তেজনা প্রশমিত হতেই হারানো শ্রমবাজার দ্রুত ফিরে পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজারের সন্ধানও সমান তালে চালাতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button