অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫৪৯৬ কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লি. (বিসিপিসিএল) ও বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লি. (বিআইএফপিসিএল)-এর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিপরীতে ভর্তুকির অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় সেই বকেয়া দায় পরিশোধ করতে হয়েছে বর্তমান সরকারকে। এ লক্ষ্যে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের ভর্তুকি বাবদ দুই দফায় মোট ৫ হাজার ৪৯৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের আগস্ট-ডিসেম্বর সময়ের জন্য ৩ হাজার ৮৭৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ের জন্য ১ হাজার ৬২৩ কোটি ২১ লাখ টাকা গত ৮ মার্চ ও ১৫ মার্চ ছাড় করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা/উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন ছাড়া দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিউবো) ট্যারিফ ঘাটতির বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। অর্থ বিভাগের ৬ ডিসেম্বর ২০১৬ এবং ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি করা আর্থিক ক্ষমতা পুনঃনির্ধারণ সংক্রান্ত পরিপত্র অনুযায়ী, গণখাতে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনুন্নয়ন খাতে ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে সব প্রস্তাবে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক। একই বিষয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২০ আগস্ট ২০২৪ এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের কার্যপরিধিতেও উল্লেখ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পাঠানো আইপিপি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তালিকায় জয়েন্ট ভেঞ্চার পাওয়ার প্ল্যান্ট বিসিপিসিএল ও বিআইএফপিসিএল এবং পাবলিক পাওয়ার প্ল্যান্ট অন্তর্ভুক্ত থাকায় ভর্তুকি হিসাবায়নের আগে প্রতিটি কেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদনের বিষয়টি যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়, তালিকাভুক্ত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কোনগুলো অনুমোদিত এবং কোনগুলো অনুমোদনবিহীন। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, তালিকাভুক্ত ১১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১০২টির ট্যারিফ অনুমোদিত হলেও দুটি জয়েন্ট ভেঞ্চার, আরপিসিএলের চারটি এবং বি-আর পাওয়ারজেনের দুটিসহ মোট আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদন নেই। এ অবস্থায় ১৪ মে ২০২৫ থেকে এসব কেন্দ্রের ভর্তুকি স্থগিত রাখা হয়। তবে সাধারণ নির্বাচন, রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার স্বার্থে তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টার অনুমোদন নিয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ট্যারিফ ঘাটতির বকেয়া ভর্তুকি দুই ধাপে ২৯ মে ২০২৫ ও ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শর্ত দেওয়া হয়, অনুমোদনবিহীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ট্যারিফ দ্রুত অনুমোদন নিতে হবে।
২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বিসিপিসিএল ও বিআইএফপিসিএল ছাড়া বাকি ছয়টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদিত হয়েছে। এরপর অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর ভর্তুকি বকেয়াসহ ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৪২ কোটি টাকা বাজেট-১ শাখা থেকে পরিশোধ করা হয়। অন্যদিকে অনুমোদনবিহীন দুই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে বিসিপিসিএলের ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তুকি দাঁড়ায় ২ হাজার ৩১৪ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা। একই সময়ে বিআইএফপিসিএলের ভর্তুকি ১ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। ফলে ওই সময়ের জন্য দুই কোম্পানির মোট ভর্তুকি ৩ হাজার ৮৭৩ দশমিক ১৮ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের ভর্তুকি যুক্ত হয়ে মোট বকেয়া ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৯৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এ অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব অর্থ উপদেষ্টার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে তিনি চলতি মার্চ মাসের ৮ ও ১৫ তারিখে কয়েকটি শর্তে তা অনুমোদন দেন। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৈদেশিক ঋণ বিদ্যমান থাকায় ট্যারিফ সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট ঋণদাতাদের ছাড়পত্র গ্রহণ করা আবশ্যক। তবে এখনো সেই ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি। ফলে সংশোধিত ট্যারিফসহ প্রস্তাব সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে। এছাড়া দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে রিটার্ন অন ইক্যুইটি (আরওই)-সহ বিভিন্ন খাতে সমন্বয়ের মাধ্যমে ট্যারিফ কমানোর সুযোগ রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ভর্তুকির চাপ হ্রাস পাবে। বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বিল সময়মতো পরিশোধ করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ভর্তুকির অর্থ না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না।



