খুলনাঞ্চলে এবার ৭২৩ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রির টার্গেট!

চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮,০৫৫ হেক্টর, অর্জিত হয়েছে ১৩,৮১০ হেক্টর
খরচের বিপরীতে লভ্যাংশ আসবে ৪১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা
মোঃ আশিকুর রহমান ঃ গ্রীষ্মের রসালো ফল তরমুজ। উত্তপ্ত রোদে দেহের সামায়িক স্বস্তি পেতে তরমুজের যেন বিকল্প নেই। তরমুজের প্রধান উৎপাদন ক্ষেত্র দক্ষিণাঞ্চল। তবে পটুয়াখালী চরাঞ্চলেও তরমুজের একটি বড় অংশ চাষাবাদ হয়ে থাকে। এছাড়া পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা ও ভোলা জেলায়ও তরমুজের চাষ হয়েছে। সাধারণত ফেব্রুয়ারী থেকে এপ্রিল মাস তরমুজ চাষের উপযুক্ত সময়, তবে অনেক কৃষক জানুয়ারীতে তরমুজ আবাদ শুরু করে থাকেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চলের দেওয়া তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের রবি মৌসুমের ফসল খুলনাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৫৫ হেক্টর জমি, অর্জিত হয়েছে ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর। যার মধ্যে খুলনা জেলা ১৭ হাজার ২৯১ হেক্টরের বিপরীতে অর্জন ১৩ হাজার ১৫৬ হেক্টর, বাগেরহাট জেলায় ১৩৩ হেক্টরের বিপরীতে অর্জন ১৬৪ হেক্টর, সাতক্ষীরা জেলায় ৬১৮ হেক্টরের বিপরীতে ৪৭১ হেক্টর ও নড়াইল জেলায় ১৩ হেক্টরের বিপরীতে অর্জন ১৯ হেক্টর জমি। কৃষকেরা জানিয়েছেন, বিঘা প্রতি তরমুজের উৎপাদন সংখ্যা ৭০০-৮০০টি এবং বিঘা প্রতি তরমুজের উৎপাদন খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা করে। আর বিঘাপ্রতি তরমুজ বিক্রি হবে ৭০ হাজার টাকা করে। একজন কৃষক বিঘা প্রতি তরমুজ উৎপাদনে লাভের মুখ দেখেবে ৪০ হাজার টাকা।
১৩,৮১০ হেক্টর জমিতে তরমুজের মোট উৎপাদন (প্রতি বিঘায় ৭০০ টি হলে) ৭ কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ২০০ টি এবং (প্রতি বিঘায় ৮০০ টি হলে) ৮ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ৮০০ টি। অর্জিত ১৩,৮১০ হেক্টর জমিতে মোট উৎপাদন খরচ ৩১০ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
অর্জিত ১৩,৮১০ হেক্টর জমিতে মোট বিক্রয় মূল্য ৭২৩ কোটি ৫৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। অর্জিত ১৩,৮১০ হেক্টর জমিতে তরমুজ উৎপাদনে লাভ হবে ৪১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এই সূত্র জানান, এ বছর খুলনাঞ্চলের ৪ জেলায় তরমুজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ হাজার ৫৫ হেক্টর নির্ধারিত হলেও অর্জিত হয়েছে ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর জমি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে এই অঞ্চলের প্রান্তিক চাষিরা গত অর্থ বছরে তরমুজে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে কাঙ্খিত মূল্য না পাওয়ার কারনে এবছর তরমুজ চাষে আগ্রহ হারিয়েছে। যে কারণে এ বছর এই অঞ্চলে তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করা হলেও শতভাগ পূরণ হয়নি। চলতি অর্থ বছরে এই অঞ্চলে তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪ হাজার ২৪৫ হেক্টর কম চাষাবাদ হয়েছে।
খুলনাঞ্চলের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে খুলনা জেলার বাজুয়া, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, মোংলার বানিয়াশান্তাসহ অন্যান্য উপজেলাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। স্বল্প খরচে অধিক লাভের কারণে এই অঞ্চলের কৃষকরা দিন দিন তরমুজ চাষে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে এই অঞ্চলের কৃষকেরা তরমুজ চাষে দারুন সফলতা ও লাভের মুখ দেখবে এবং এই অঞ্চলের উৎপাদিত তরমুজ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দাকোপ উপজেলার এলাকার কৈল্লাশগঞ্জ ইউনিয়নের হরিণটানা ব্লকের কৃষক ইন্দ্রজিং জানান, আমি এবার কয়েক বিঘা জমিতে তরমুজের চাষাবাদ করেছি। বিঘা প্রতি খরচ পড়েছে ২৮-৩০ হাজার টাকা। এবার ফলন বেশ ভালো হয়েছে। প্রতি বিঘাতে ৮/৯’শ পিস তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। আশাকরি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে ভালো লাভ হবে।
বটিয়াঘাটা উপজেলার উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা (হালিয়া ব্লক) মোহাম্মাদ তারিকুল ইসলাম জানান, আমার ব্লকে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষাবাদ হয়েছে। ক্ষেতে কৃষক এখন পরিচর্যা, কীটনাশক প্রয়োগ ও সেক্সফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করছে। কোনো বড় ধরনের দুর্যোগ দেখা না দিলে কৃষকেরা তরমুজ চাষাবাদে দারুন লাভবান হবে।
দাকোপ উপজেলার উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা করুনা কান্ত সরকার জানান, চুনকুড়ি ব্লকে ৪০০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ করা হয়েছে। পরিচর্যাসহ পানির সাথে সার মিশিয়ে সেচের সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে এবং মাতৃ পোকা (ফলের মাছি) দমনের জন্য সেক্সফেরোমন ফাঁদ স্থাপন ও হলুদ আঠালো ফাঁদ স্থাপন করা হচ্ছে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে এই এলাকার কৃষকেরা এবার তরমুজ চাষে লাভবান হবে। আগামী ১৫/২০ দিন পর থেকে তরমুজ কর্তন শুরু হবে।
খুলনার দাকোপ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ২৮টি ব্লক নিয়ে দাকোপ উপজেলা। খুলনাঞ্চলে মধ্যে দাকোপ উপজেলাতে সবচেয়ে বেশি তরমুজের আবাদ হয়ে থাকে। চলতি অর্থ বছরে এই উপজেলায় তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমি। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৬ হাজার ৮০০ হেক্টর। গত বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে কৃষকের ক্ষেতের তরমুজের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং কৃষক দামও কম পেয়েছে। এসব কারনে এবার অনেক কৃষক-ই তরমুজ চাষাবাদ করেনি।
তিনি জানান, উপজেলার কৃষকেরা ক্ষেতের পরিচর্যাসহ পানির সাথে সার মিশিয়ে সেচের সঙ্গে দিচ্ছে, মাতৃ পোকা (ফলের মাছি) দমনের জন্য সেক্সফেরোমন ফাঁদ স্থাপন ও হলুদ আঠালো ফাঁদ স্থাপন করা হচ্ছে। এ বছর তরমুজ চাষিদের চাহিদানুসারে সার, বীজ ও কীটনাশক প্রদান করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে এই এলাকার কৃষকেরা তরমুজ চাষে সফলতার মুখ দেখবে। আগামী ১৫/২০ দিন পর থেকে তরমুজ কর্তন শুরু হবে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চল খুলনার অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, খুলনাঞ্চলে চলতি অর্থ বছরে তরমুজ চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ হাজার ৫৫ হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও অর্জিত হয়েছে ১৩ হাজার ৮১০ হেক্টর। গত বছর খরার কারণে তরমুজ চাষিদের চরম ক্ষতি হয়। ফলন কম হয় এবং কৃষক তরমুজের দামও কম পায়। এ কারনে অনেক কৃষকই এবছর তরমুজ চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে গত বছরের তুলনায় এ অঞ্চলে এ বছর তরমুজের চাষাবাদ কমেছে। তবে এবার কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ (কালবৈশাখি ঝড়, শিলা বৃষ্টি, খরা) না হলে এই অঞ্চলের কৃষকেরা তরমুজ চাষে সফলতা ও লাভের মুখ দেখবে এবং এই অঞ্চলের উৎপাদিত তরমুজ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে রবিবার (২৩ মার্চ) খুলনার পাইকারী ও খুচরা ও বাজার ঘুরে তরমুজ বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখনো গ্রীষ্ম মৌসুমের তরমুজ বাজারে পুরাদমে আসা শুরু করেনি। চর এলাকা যে সকল চাষীরা আগাম বাজার ধরতে আগাম তরমুজের চাষাবাদ করেছিলেন, ওই সকল তরমুজই বর্তমান বাজারে দৃশ্যমান। তবে খুলনার স্থানীয় এলাকা সমূহ, বিশেষ করে দাকোপ, বটিয়াঘাটা, বাজুয়া, বানিয়াশান্তাসহ অন্যান্য অঞ্চলের তরমুজ আর ১৫-২০ দিনের মধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করবে।
খুলনার কদমতলার পাইকারী ফল বাজারে বড় সাইজের তরমুজ (৬-১০ কেজি) ১০০ পিচ বিক্রি হচ্ছে ২৫-২৬ হাজার টাকায়, মাঝারী সাইজের তরমুজ (৪-৫ কেজি) ১০০ পিচ বিক্রি হচ্ছে ১২-১৩ হাজার টাকায় এবং ক্যাট (ছোট) সাইজের তরমুজ ১০০ পিচ বিক্রি হচ্ছে ৪/৫ হাজার টাকায়। খুচরা বাজারে বর্তমানে বড় সাইজের তরমুজ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৩০-৩৫ টাকায়, মাঝারী সাইজের তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকায় এবং ক্যাট বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকার উপরে।
দৌলতপুর বাজার ফল ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন আহম্মেদ রাজু জানান, এখনো গ্রীষ্ম মৌসুমের তরমুজ বাজারে পুরাদমে আসা শুরু করেনি। চর এলাকা যে সকল চাষীরা আগাম বাজার ধরতে আগাম তরমুজের চাষাবাদ করেছিলেন, ওই সকল তরমুজই বর্তমান বাজারে দৃশ্যমান। সপ্তাহ দু’য়েক পর খুলনার ফল বাজারে তবে স্থানীয় এলাকা দাকোপ, বাজুয়া, বটিয়াঘাটার গ্রীষ্মকালীন তরমুজ বাজারে আসা শুরু করবে। এ বছর তরমুজ বেশ সস্তা, সামনে দাম আরো কমবে।



