ভৈরব নদে ট্যাংকারের তেল চুরির মহোৎসব চলছে

# আইন প্রয়োগকারী সকল সংস্থার কর্মকর্তাগণ নিরব দর্শক #
# চোরচক্রের সঙ্গে ডিলার ও ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীর আঁতাত ধরা পড়লে মুহূর্তেই তৈরি হয়ে যায় কাগজপত্র #
সৈয়দ জাহিদুজ্জামান দিঘলিয়া প্রতিনিধি ঃ খুলনার মেসার্স পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপোতে আসা ট্যাংকার থেকে লাখ লাখ টাকার জ্বালানি তেল সুকৌশলে চোরদের হাতে চলে যাচ্ছে। অনেকটা প্রকাশ্যেই তেল চোররা তৎপর থাকলেও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রহস্যজনক কারণে থাকছে নীরব। এতে এক দিকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আয়। একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভৈরব নদী তীরে গড়ে ওঠেছে মেসার্স পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নামে তিনটি জ্বালানি তেলের ডিপো। এসব ডিপোতে বিভিন্ন রকম জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম থেকে লোড নিয়ে আসা জাহাজগুলো ভৈরব নদীতে নোঙর করে ৪/৫ দিন ধরে তেল খালাসের জন্য অপেক্ষা করে। অভিযোগ রয়েছে, খুলনা নগরীর কাশিপুর, নদীর পাড়ে ঘর বেঁধে ও ফরমাইশখানা গ্রামের একটা মহল নানা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে আঁতাত করে সুকৌশলে ওই জাহাজগুলো থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার তেল চুরি করে দিঘলিয়া ও খুলনা শহরের বিভিন্ন দোকান ও ডিলারের কাছে বিক্রি করছে। সূত্র জানায়, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপোর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তেল ট্যাংকারের (জাহাজের) অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আঁতাত করে তেল পাচার করে খুলনা ও আশপাশের জেলাগুলোতে বিক্রি করছে। এসব তেলের মধ্যে ফার্নেস ওয়েল, ডিজেল, পেট্রোল, কেরোসিন, অকটেন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব চোরাই তেল সংরক্ষণ ও কেনাবেচার জন্য খালিশপুর ও কাশিপুরে বাড়ির মধ্যে ভূমিতে হাউস করা হয়েছে। কেউ কেউ রাস্তার পাশে শার্টার যুক্ত ঘর করেছে। কেউবা নদীর কুলে বা ডিপোগুলোর রাস্তার পাশ দিয়ে বেড়া বা শার্টারযুক্ত ঘর করেছে। ট্যাংকলরিগুলো ডিপো থেকে তেল লোড নিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় জ্বালানি তেল চুরির মহৌৎসব। এই তেল চোরচক্রের সঙ্গে বিভিন্ন ডিলার ও ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আঁতাত থাকে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তেল ধরা পড়লে মুহূর্তের মধ্যে বৈধ মালিকানাট কাগজপত্র তৈরি হয়ে যায়। এসব তেল চোর ট্যাংকলরি ডিপো থেকে বের হলেই ঘরের শার্টার খুলে ড্রাম নিয়ে নিজেরাই পাইপ খুলে দিয়ে তেল ভর্তি করে আবার ঘরের শার্টার বন্ধ করে দেয়। রাস্তার পাশে ঘর করে তেল চোরাকারবারি আছে প্রায় ২ শতাধিক। কেউ কেউ গড়ে তুলেছে স্থাপনাও।
এক সূত্র থেকে জানা যায়, এ ডিপোগুলোর জ্বালানি তেল লোড দেওয়ার কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের সঙ্গে ওয়াগন ও ট্যাংকলরি চালক ও শ্রমিকদের আঁতাত থাকে। তারা গোপন সালামির বিনিময়ে প্রয়োজনীয় তেলের চেয়েও বেশি লোড করে। সেই তেল ডিপো থেকে বেরিয়ে নির্ধারিত ঘরে গিয়ে বিক্রি করে দেয় ট্যাংকলরির চালক ও কর্মচারীরা। এমনকি এ চোরাই চক্র ডিপো থেকে খুলনাগামী ট্রেন লাইনের পাশেও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ট্রেনের জ্বালানি তেলভর্তি ওয়াগন থেকে তেল চুরি করে আসছে বছরের পর বছর ধরে। এদিকে কাশিপুরের একটি তেল চোরাই চক্র বিভিন্ন নৌকা নিয়ে ভৈরব নদীতে নোঙর করা ট্যাংকার থেকে ক্যানভর্তি করে তেল চুরি করে। এ তেল চোরাই চক্রের মধ্যে রয়েছে খুলনা নগরীর কাশিপুর ও দিঘলিয়া থানার সদর ইউনিয়নের ফরমাইশখানা গ্রামের কিছু লোক। অথচ আইনপ্রয়োগকারী সব সংস্থা অজ্ঞাত কারণে নীরব দর্শক।
সূত্র থেকে আরো জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে আসা জাহাজগুলো ভৈরব নদের তীরের একটি মহলের মাধ্যমে ২০/৩০ হাজার টাকা ডাকে বিক্রি হয়। ঘাটের ওপরের একজন ও একজন নৌকা মাঝি সারা বছর এ জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং তেল পাচার করে। নতুন নতুন জাহাজ এলেই এভাবে বেচাকেনা হয়। ফলে প্রতি বছর পেট্রোবাংলার কোটি কোটি টাকার জ্বালানি তেলের ক্ষতি ও অপচয় হয়। সরকার হারায় মোটা অংকের রাজস্ব। দিঘলিয়ার একটা প্রভাবশালী মহল নেপথ্যে থেকে এ অবৈধ ব্যবসা বছরের পর বছর চালিয়ে আসছে বলে জানা যায়।
কয়েক বছর আগে দিঘলিয়া থানা পুলিশ ও অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে এ তেল চোরচক্র ঘরে উঠলেও বর্তমানে পুনরায় জোরেশোরে শুরু করেছে তাদের অবৈধ কারবার। এ অবৈধ তেল চুরির আধিপত্যকে কেন্দ্র করে শিশু বাচ্চু, সাকিব, মামুনসহ কয়েকটি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে ফরমাইশখানা বার্মাশেল খেয়াঘাটের আশপাশে। এই অবৈধ তেলের ব্যবসা ও ঘাটের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ফরমাইশখানা গ্রামের খলিল মোড়ল, দিঘলিয়া সদর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মোল্লা হারুন অর রশিদ ও শেখ ফরহাদ হোসেন চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন। কেউবা মিথ্যা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শুধু ঘাট নয় এলাকা ছাড়া হয়েছে। কেউ কেউ বলছে, মুন্না হত্যা রহস্য এই জ্বালানি ব্যবসার আধিপত্যের সাথে জড়িত থাকতে পারে।
খালিশপুর থানার ওসি তৌহিদুজ্জামান জানান, আমরা যেখানে অভিযোগ পাচ্ছি সেখানেই অভিযান পরিচালনা করছি। অনেক তেল উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। অবৈধ এ কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নদীতে যে ঘটনা ঘটে সেটা দেখবে নৌ থানা পুলিশ। কেএমপি সদর নৌ থানার ওসি বাবুল আক্তারের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।



