টিকা অব্যবস্থাপনার দায় কার

# হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব #
টিকা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সফলতা নতুন নয়। নিয়মিত টিকার মাধ্যমে দেশে অন্যান্য সংক্রামক রোগ নির্মূলের পাশাপাশি হামও নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য হাম সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিদিনই নতুন করে সংক্রমণের খবর আসছে। দৈনিক প্রবাহ’র গতকাল প্রকাশিত খবরে বলা হয়, হামের সংক্রমণ বেড়েছে ৭৫ গুণ। কয়েক দিন থেকেই বলা হচ্ছে, টিকা প্রদানে অব্যবস্থাপনার কারণেই আজকের এই দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই অবহেলা-অব্যবস্থাপনার মূল্য দিতে হলো জীবন দিয়ে। এর দায় সংশ্লিষ্টরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। অবহেলাজনিত কারণে শতাধিক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগে তাদের আইনের মুখোমুখিও করা যেতে পারে। খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৬৭৬ শিশু, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ গুণ বেশি। গত বছর একই সময়ে আক্রান্ত ছিল মাত্র ৯ জন, ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ৬৪-তে আটকে ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তারা এখন পর্যন্ত এই রোগে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে মহামারির দিকে যাচ্ছে। এ জন্য সংক্রমণের বিস্তার রোধে শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মক ব্যাহত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে টিকার মজুদ থাকলেও লোকবলের অভাবে টিকা কর্মসূচি চলেনি। আবার অনেক সময় টিকারও ঘাটতি ছিল। ওই সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপির মতো সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা বাতিল করেছে। এ ছাড়া নতুন প্রকল্প তৈরি, প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থছাড়Íসব কিছুতেই ঢিলেঢালা ভাব দেখা গেছে। অন্তর্র্বতী সরকারের দেড় বছরে টিকা ক্রয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ পদেও বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। এ সব কিছুর প্রভাব পড়েছে টিকা কর্মসূচিতে। বহু মায়ের বুক খালি হয়েছে এবং হচ্ছে। একটি দেশে সরকার আসবে-যাবে, এটাই নিয়ম। তাই বলে জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে দায়িত্বহীনতা ও অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না। ‘সরকার পরিবর্তন’ এসব অব্যবস্থাপনার অজুহাত হতে পারে না। এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এ ছাড়া দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এত শিশুর জীবন গেল, বহু শিশু হাসপাতালে কাতরাচ্ছে, এর জন্য দায়ীরা প্রশ্নহীন থেকে যাবে, তা হতে পারে না। বর্তমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেনের পরামর্শ হলো, তিনটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে। প্রথমত, দ্রুত হামের টিকা এনে তা প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইপিআইয়ের অভিজ্ঞতা এবং তাদের হাজারো তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবককে কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাব্যবস্থার দ্রুত বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে এবং তৃতীয়ত, মাঠ পর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকারসংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে।
