সম্পাদকীয়

সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ অতীব জরুরি

এখন পর্যন্ত নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়িত না হওয়ায় আমাদের দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিনিয়তই ঘটে চলছে দুর্ঘটনা। আহত-নিহত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। ঈদযাত্রায়ও এই দুর্ঘটনা থেমে থাকে না। ফলে আনন্দের ঈদ অনেক পরিবারে হয়ে ওঠে বিষাদের কালো ছায়া। দেশের সার্বিক যোগাযোগ ও উন্নতি-অগ্রগতির ক্ষেত্রে এসব দুর্ঘটনা মারাত্মকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আবার সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সম্পদ। সড়ক দুর্ঘটনার মতো দেশে প্রায়ই ঘটে নৌদুর্ঘটনা। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা আর নৌদুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতিবছরই নৌদুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষ আহত, নিহত ও নিখোঁজ হয়ে থাকে। তখন চোখে পড়ে স্বজন হারানো ব্যক্তিদের আহাজারি। এ নিয়ে কিছুদিন হৈচৈ হয়। গণমাধ্যমগুলোতেও তখন ফলাও করে খবরাখবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। আর যথারীতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলে থাকেন, ঘটনার সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যস, হয়ে গেল। এর কিছুদিন পরেই দেশে ঘটল অন্য একটি বড় ঘটনা। তখন চাপা পড়ে যায় ওই নৌদুর্ঘটনার ঘটনা। তখন আর কেউ জানতে পারে না ওই নৌদুর্ঘটনার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। আর এটিই হচ্ছে বাস্তবতা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, নৌপথে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর না করা, লঞ্চচালকদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা, অদক্ষতা, ফিটনেসহীন নৌযান চলাচল করার ‘সুযোগ’ পাওয়াসহ নৌযানে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করাই নৌদুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে গত ৫০ বছরে বিভিন্ন নৌদুর্ঘটনায় ২০ হাজার ৫০৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং প্রায় তিন হাজার ৪১৭ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। আর বেশির ভাগ দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ নকশা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও অদক্ষ চালক। এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ছয় হাজার নৌপথ রয়েছে, যার বেশির ভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় তিন হাজার ছোট-বড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও অনুমোদনহীনভাবে চলছে কয়েক গুণ বেশি নৌযান। তা ছাড়া নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যতসংখ্যক নৌ পুলিশ থাকা প্রয়োজন, তা নেই। এসব নৌ পুলিশকে বিআইডব্লিউটিএর কিছু সার্ভে জাহাজ ও স্পিডবোট দেওয়া হলেও এসব নৌযানে নৌপথের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক যান। ওদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে ছয় হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছে। এই সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা ৬.৯৪ শতাংশ এবং প্রাণহানি ৫.৭৯ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে মোটরসাইকেলে (৩৭ শতাংশ)। আর এর মূল কারণ হলো বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন। বলা বাহুল্য, ঢাকা শহরের মধ্যে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী ওঠানামার ক্ষেত্রে এক ধরনের নগ্ন প্রতিযোগিতা চলে। এ ধরনের প্রতিযোগিতার বিভিন্ন করুণ পরিণতিও দেশবাসী বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ করেছে। গণপরিহন খাতে প্রশিক্ষিত চালক না থাকা এবং চুক্তি ভিত্তিতে চালকের হাতে বাস মালিকপক্ষ কর্তৃক বাস ছেড়ে দেওয়ার জন্যই মূলত এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার কর্তৃক নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ফলাফল শূন্য। মূলত রাজনীতি এবং চাঁদাবাজির কারণে এ ধরনের উদ্যোগ অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভেস্তে গেছে। সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের সড়ক-মহাসড়কে যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে, তা কমাতে দূরপাল্লার গাড়িতে বিকল্প চালক রাখা; একজন চালকের পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানো; গাড়ির চালক ও তাঁর সহকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া; নির্দিষ্ট দূরত্বে সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি; অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা বা সিগন্যাল মেনে পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। দেশে প্রতিনিয়ত মর্মান্তিক সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনা ঘটে চললেও এসব দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর দেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আর এতে প্রায় সমানসংখ্যক মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। দেশের সড়ক-মহাসড়গুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই জনগণের কপালের লিখন বলা যাবে না, বরং তা এক প্রকার হত্যাকা-। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। অন্যদিকে অদক্ষ চালক, ট্রাফিক আইন না মানা এবং ফিটনেসহীন গাড়ি ও নৌযান চালানোর মধ্য দিয়ে অসংখ্য মানুষের মূল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। অথচ সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য কোনো বিষয় নয়। এ জন্য দরকার সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার উপযুক্ত বাস্তবায়ন। রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট স্থাপনসহ ফুটপাতে নির্বিঘ্নে হকারদের ব্যবসা করার ‘সুযোগ’ করে দেওয়া, অপরিকল্পিত ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা, ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি, খেয়ালখুশিমতো যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্ক করা, সড়ক-মহাসড়কের ওপর রিকশা, ভ্যান, টেম্পো ও ট্যাক্সি স্ট্যান্ড স্থাপন করা, রাস্তার মাঝখানে ডাস্টবিন স্থাপন করা, সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়নকাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করা এবং অসৎ উদ্দেশ্যে একই রাস্তা বছরে বারবার খনন করা, জনগণ কর্তৃক রাস্তা পারাপারের নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে না মানার কারণে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে। সর্বোপরি সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুধীসমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণকে একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোসহ নৌপথ মৃত্যুফাঁদের পরিবর্তে হয়ে উঠবে নিরাপদে চলার পথ হিসেবে, যা আমার, আপনার সবারই একান্ত কাম্য।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button