স্থানীয় সংবাদ

জ্বালানি সংকট উত্তোরণে সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্বারোপসহ ১৩ দফা সুপারিশ

খুলনায় প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরামের সংবাদ সম্মেলন

স্টাফ রিপোর্টার : বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি সংকট থেকে উত্তোরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদী সংকট মোকাবেলায় সরকারের কাছে ১৩ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা প্রেস ক্লাবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরামের (ফেড) পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাবনা পেশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সংগঠনের সদস্য সাংবাদিক ও গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন ফোরামের আহবায়ক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বর্তমান জ্বালানি সংকটে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খাত, কৃষি ও শিল্প-কারখানার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থায় বর্তমান সংকট আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর সফল দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে জ্বালানি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের একটি সুযোগ এনে দিয়েছে।
উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, চীন বহু আগে থেকেই পেট্রোলিয়াম-নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। অপরদিকে, পাকিস্তান জন-জ্বালানি বিপ্লবের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত, যা দেশটির অর্থনীতিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা তুলে ধরে বলা হয়, দেশে ৪ কোটি ২ লক্ষ ৬০ হাজার পরিবার রয়েছে। যে খাতে জাতীয় গ্রিডের ৫৭% বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। এই পরিবারগুলোর ৪১% অন্তত ১ কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারে। এতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বিস্ময়করভাবে ১৬,৩৬১ মেগাওয়াট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বার্ষিক ২৬,৫১৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। ফার্নেস অয়েল থেকে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে শুধু জ্বালানি খরচ বাবদই ৪৮,৮১৩ কোটি টাকা লাগবে। প্রতি মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে প্রতি বছর ২.৯৮ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে। ছাদে সৌর প্যানেলের ব্যাপক ব্যবহার করলে সবচেয়ে গরিব জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সুরক্ষিত থাকবে এবং বিদ্যুতের একটি স্থিতিশীল উৎস তাদের হাতে থাকবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সৌরবিদ্যুতের তথ্য দিয়ে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা কমাতে সরকারকে অবশ্যই নিজস্ব ভবনগুলো ব্যবহার করতে হবে। ২০২৫ সালের আগস্টে নেয়া ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের কর্মসূচিটি এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া, দেশের ১ লাখ ২২ হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১ হাজার ১৩৭টি কলেজ ও কারিগরী প্রতিষ্ঠান এবং ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যায়। এই স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে সরকার জ্বালানি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমালে তা শিল্প খাতে বরাদ্দ করা যাবে, ফলে কারখানার কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে, অদক্ষ গ্যাস বয়লারের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বয়লার ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া উচিৎ যাতে শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং জ্বালানি-দক্ষতা বাড়বে।
এছাড়া সৌরচালিত সেচপাম্প ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস- যেমন কৃষিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, খালের উপর ও নদীর পাড়ের সৌরবিদ্যুতের মতো অন্যান্য উৎসগুলো জ্বালানি আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে পারে। দেশজুড়ে ৩২ হাজার ৩১৫টি জলাশয়ে কমপক্ষে ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা যায়। দেশের ১,৫০০ বর্গ কিমি পুকুরের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করে ১৫ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তিগুলো জমির স্বল্পতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার পাশাপাশি সবুজ জ্বালানি সরবরাহ করবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
উল্লিখিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে ১৩ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। সুপারিশগুলো হচ্ছে-
১. জ্বালানি বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য : বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়া উচিত। ভাষণে সর্বোচ্চ জ্বালানি দক্ষতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নাগরিকদের প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণের আহ্বান জানানো উচিত। এছাড়া প্রতিটি বাড়িতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, বাড়িতে বসে দাপ্তরিক কাজের প্রসার, ব্যক্তিগত যানবাহন পরিহার এবং রান্নার জন্য এলপিজি’র পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করার আহ্বান জানানো দরকার।
২. জীবাশ্ম জ্বালানির ঋণচক্র থেকে দূরে থাকা : ইতোমধ্যেই একটি গোষ্ঠী আরো জ্বালানি আমদানি করার জন্য ঋণ গ্রহণ করা, নতুন কয়লাখনি খননের উদ্যোগ নেয়া এবং কয়লা-বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ানোর প্রস্তাব দিচ্ছে। এসব প্রস্তাবে সায় দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সমাধান তো আসবেই না, বরং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ আরো আমদানি, আরো পরিবেশ ধ্বংস ও আরো কার্বন নির্গমনের ফাঁদে আটকে যাবে।
৩. নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য আর্থিক প্রণোদনা : নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর থেকে সকল আমদানি শুল্ক, কর এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) তুলে দিতে হবে। এর ফলে ব্যক্তিগত ও শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ কমে যাবে।
৪. জাতীয় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি : ২০২৫ সালের শেষের দিকে ঘোষিত জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় অবিলম্বে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ সমাপ্ত করতে হবে। প্রতিটি ব্যক্তিগত সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে ৩ কিলোওয়াট পর্যন্ত প্রতি কিলোওয়াটে ২৫ হাজার টাকা (২০৫ ডলার) ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে নারী ও আদিবাসীদের অতিরিক্ত ১০% ভর্তুকি দিতে হবে।
৫. সৌর পার্ক দ্রুত অনুমোদন করা : ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন বেসরকারি ৩১৭ মেগাওয়াট সৌর-বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ অবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদিত ৯১৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) অবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে।
৬. সৌর সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ : বর্তমানে প্রতি বছর মাত্র ২০০-২৫০টি সৌরচালিত সেচপাম্প স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই এক বছরের মধ্যে নেট মিটারিং সংযোগসহ কমপক্ষে ১০ হাজার সৌরচালিত সেচপাম্প স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।
৭. পরিবহণ খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমানো : ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ প্রধান শহরগুলোতে গণপরিবহনের জন্য অবিলম্বে বৈদ্যুতিক বাস সংগ্রহ ও চালু করতে হবে। পরিবহন খাতে পেট্রোলিয়াম-নির্ভরতা কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট এবং অন্যান্য কর যত দ্রুত সম্ভব তুলে নিতে হবে।
৮. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দক্ষতা উন্নয়ন : তরুণ, নারী, আদিবাসী এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের জন্য অবিলম্বে একটি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে যাতে সৌরশক্তি স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় কমপক্ষে ১০ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
৯. স্বল্প-সুদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল : ব্যক্তিগত ও শিল্প-কারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং সৌরচালিত সেচপাম্পের উদ্যোগে সহায়তা সহায়তা করার জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি আবর্তন তহবিল গঠন করতে হবে। এই তহবিল সঞ্চালনে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কোনো সুদ নেবে না এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ন্যূনতম সুদ (৪%-এর কম) গ্রহণ করবে।
১০. নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ : নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ন্যূনতম বাজেট বরাদ্দের ধারা ভেঙে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অধীনে জ্বালানি বাজেটের কমপক্ষে ৪০% নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বরাদ্দ করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বেসরকারি খাতকে ছাড়িয়ে যায় এবং জ্বালানি সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী হয়।
১১. পরিচালন দক্ষতা এবং মেধাক্রম : বিদ্যমান উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ফ্রি গভর্নর মোড অপারেশন (ঋএগঙ) নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা কাজে লাগানো যাবে এবং সর্বনি¤œ খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা ব্যয়বহুল তেল-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা কমাবে।
১২. পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার : যত দ্রুত সম্ভব রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (আরএনপিপি) পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ন্যূনতম সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
১৩. টেকসই জ্বালানির জন্য ভর্তুকি সংস্কার : বিদ্যুতের দামের উপর থেকে ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে তুলে নিতে হবে। এর ফলে ভোক্তাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা অর্থনৈতিকভাবে আরও লাভজনক হয়ে উঠবে এবং বিকেন্দ্রীভূত সমাজভিত্তিক নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের যুগ্ম আহবায়ক ও খুলনা প্রেস ক্লাবের আহবায়ক এনামুল হক, সদস্য সচিব হুমায়ূন কবির ববি, সদস্য অজান্তা দাস, সাংবাদিক আবু হেনা মোস্তফা জামাল পপলু, দিপংকর রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button