জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বাচ্চাদের হাম, স্কুল পরিচালনা চ্যালেঞ্জ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ বিশ্বজুড়ে চলছে জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশও এই সংকটের বাইরে নয়। দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে সংকট। এরই মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত ও ব্যাংকের অফিস সময় কমিয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পদ্ধতির বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। যদিও অনলাইন ও অফলাইন (সশরীরে) ক্লাস নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে আজ সিদ্ধান্ত হবে। শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি মাথায় রাখার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে হামের যে প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে, সেটিও বিবেচনায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে। মার্চ মাসের শুরু থেকেই দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। ঈদের পর এই সংকট আরও বেড়েছে। চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা এবং গ্রাহকদের বাড়তি জ্বালানি তেল কেনার প্রবণতা এই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে। সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের সংকট নেই বলা হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত মানুষের মধ্যে তেল কেনার হিড়িক পড়েছে। প্রতিদিন পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে গরমকালে বোরো মৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এবারের ঈদুল ফিতরের সময় হাসপাতালগুলোতে হামের চিকিৎসা নিতে শিশুদের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। পাশাপাশি মৌসুমি জ্বর, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। হামসহ শিশুদের এসব রোগ-বালাইয়ের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে রোববার (৫ এপ্রিল) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সরকার জানিয়েছে। গত ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা এবং শপিংমল সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা এবং ব্যাংকিং সেবা সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। জরুরি সেবা ব্যতীত সব অফিস ভবন, বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ রাখতে হবে বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি আরও জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তী মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। জ্বালানি তেলের ব্যবহার ও পরিবেশ দূষণ কমানোর লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব সম্পূর্ণ নতুন ইলেকট্রিক বাস নিবন্ধিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিনা শুল্কে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সর্বসাকুল্যে ২০ শতাংশ শুল্কে আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শনিবার (৪ এপ্রিল) কুমিল্লায় জানিয়েছেন, অনলাইনে ক্লাসের বিষয়টি শুধু মহানগর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে রোববার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। গত ১ এপ্রিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অংশীজনদের সঙ্গে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা স্কুল পরিচালনা নিয়ে মতামত দেন। তাদের প্রায় সবাই অনলাইন ক্লাসের বিরোধিতা করে বলেন, করোনা মহামারির সময় অনলাইন ক্লাস চালু করায় শিশুদের মধ্যে মোবাইল আসক্তি বেড়ে গেছে। এতে শিশুদের নৈতিক স্খলন ঘটেছে। আবার অনলাইন ক্লাস চালু করা হলে মোবাইল আসক্তির সঙ্গে নৈতিক অবক্ষয়ও বাড়বে। শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর জোট গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, অনলাইন ক্লাসের বিকল্প ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, করোনাকালে অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। এতে বিভিন্ন শ্রেণির শিশুদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়েছিল। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় বড় স্কুলগুলো নিজস্ব স্কুলবাস চালু করতে পারে, যাতে অনেক শিশু একসঙ্গে যাতায়াত করতে পারে। শিক্ষকরা অনলাইন ক্লাসের বিরোধিতা করে আসছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সভাপতি এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী জানান, অনলাইন ক্লাসের পরিবর্তে প্রয়োজনে মর্নিং ক্লাস চালু করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং বিদ্যুতের সাশ্রয়ও হবে। জাহিদুল হক নামে একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনলাইন ক্লাস মানে শিক্ষার্থীদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম থেকে শনিবার জানানো হয়, ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার চারশ ৭৯ জন। এর মধ্যে মোট নিশ্চিত রোগী চার হাজার আটশ ২৮ জন। এ সময়ের মধ্যে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে আটশ ২৬ জন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে দুই হাজার ছয়শ ৫৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে সন্দেহজনক হাম রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৮। হামের এই প্রকোপের মধ্যে পুরান ঢাকার একজন স্কুল শিক্ষক বলেন, অনলাইন ক্লাসের পরিবর্তে ক্লাসের সময় কমিয়ে পাঠদান করা যেতে পারে। পাশাপাশি হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে স্কুল পরিচালনার বিষয়টি নিয়েও ভাবতে পারে সরকার।



