স্থানীয় সংবাদ

খুলনা বিভাগে হামের সংক্রমণের গতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

# ৬ দিনে রোগী বেড়ে ৩৫১ : মৃত্যু ২ #

কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনা বিভাগে হামের সন্দেহভাজন সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে রোগীর সংখ্যা ৬৬ থেকে বেড়ে ৩৫১-এ পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষায় ‘বিস্ফোরণধর্মী’ বৃদ্ধি। ইতোমধ্যে দুই শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ (৫ এপ্রিল) তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ খুলনা বিভাগে মোট সন্দেহভাজন রোগী ছিল ৬৬ শিশু। এরপর ধারাবাহিকভাবে ৩১ মার্চ ১০০, ১ এপ্রিল ১৫৪, ২ এপ্রিল ১৮০, ৩ এপ্রিল ২৩৭, ৪ এপ্রিল ২৯৯ এবং ৫ এপ্রিল ৩৫১ শিশুর মধ্যে রোগ শনাক্ত হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন শিশু যুক্ত হওয়ায় সংক্রমণের গতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জেলাভিত্তিক চিত্রে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে কুষ্টিয়া জেলায়-১০৯ শিশু, যেখানে দুই শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। এরপর রয়েছে যশোর ৭০, খুলনা সিটি কর্পোরেশন ৫৪, ঝিনাইদহ ১৬ ও সাতক্ষীরা ১৭। তুলনামূলক কম হলেও মাগুরা ২২, নড়াইল ১২, মেহেরপুর ২৬, চুয়াডাঙ্গায় ৭ ও বাগেরহাট ১৩ শিশু হামের সন্দেহভাজন রোগী রয়েছে, যা সংক্রমণ বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের ঘাটতি, শিশুদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ, প্রাথমিক লক্ষণ উপেক্ষা এবং দেরিতে হাসপাতালে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। হামের উচ্চ সংক্রামকতার কারণে একজন আক্রান্ত শিশু থেকে দ্রুত অনেক শিশুর মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।
খুলনা বিভাগের (স্বাস্থ্য) পরিচালক ভারপ্রাপ্ত ডা: মোঃ মুজিবুর রহমান জানান, দেশের ১৮ জেলা ও ৩০টি উপজেলায় হামের টিকাদান রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যশোর সদরে রোববার টিকাদান ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করা হয়েছে , যা ২১ দিন চলবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলাতেও সম্প্রসারণ করা হবে। তিনি আরও জানান, হাসপাতালে আইসোলেশন বেডের কোনো সংকট নেই।
খুলনা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: মো: মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি বছরে এ পর্যন্ত হাম রোগে সন্দেহভাজন হিসেবে ৫৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ জন শিশু চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। এছাড়া পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। অন্যান্য সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার আইইডিসিআর’তে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাম কর্নার খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব রোগী হাম সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত হবে, তাদেরকে ওই কর্নারগুলোতে আইসোলেশনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করার নির্দেশনা রয়েছে, যেখানে বিশেষ হাম কর্নার চালু আছে। তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রেফার করা ১৫ জন সন্দেহভাজন শিশু রোগী খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে আরও ৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এছাড়া মীরের ডাঙ্গায় অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত ১ জন শিশু ভর্তি রয়েছে, যার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সচেতন না হলে খুলনা বিভাগে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে। তারা অভিভাবকদের শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা, লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে-খুলনা বিভাগে হামের সংক্রমণ এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এটি দ্রুত বিস্তারমান এক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button