সম্পাদকীয়

হামের মহামারির দায় কার ?

# বিস্তারিত তদন্ত হোক #

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই কার্যক্রম শুরুর পর থেকে কয়েক দশকের মধ্যে হাম কখনো এমন মহামারি আকারে দেখা দেয়নি। হাম যে এমন প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে সেটিই মানুষ ভুলে গিয়েছিল। প্রতিরোধযোগ্য সেই রোগটিই এ বছর (গতকাল পর্যন্ত) ১৩৮ শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। সরকারি সূত্রে পাওয়া এই হিসাবের বাইরেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাড়িঘরে বা ছোটখাটো ক্লিনিকে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। গতকাল প্রবাহে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরই মধ্যে ৫৬টি জেলায় হাম ভয়াবহ রূপে বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষজ্ঞরা এ জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলা, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাকে মূলত দায়ী করেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। প্রধান উপদেষ্টাসহ সব উপদেষ্টার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সরকারকে আইনি নোটিশও দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যথাসময়ে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা না করা, সময়মতো রাজস্ব খাত থেকে টিকা কেনার বরাদ্দ নিশ্চিত না করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা না দেওয়া, সর্বোপরি বিষয়টিকে একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা যে অপেশাদারসুলভ আরচণ করেছেন সেটিই এখন কাল হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টিকা সংগ্রহের যে স্বাভাবিক ধারা ছিল, দুর্নীতির অজুহাত তুলে সেটি বাতিল করা হয়েছিল অথচ নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যার ফলে টিকার সংকট তৈরি হয়। জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রধান ডা. এ কে আজাদ খান মনে করেন, শিশুরা হামে মারা যাচ্ছে, এর দায় সরকারের, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের। কারণ তারা শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, দেশে হামের এমন পরিস্থিতির জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এবং তার স্বাস্থ্য বিভাগ দায়ী। কেন সময়মতো টিকা কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হলো না, তা নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এই গাফিলতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা উচিত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী প্রবাহকে বলেন, ‘প্রতিবছর আমাদের দেশে কমবেশি ৩০ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। জন্মের পরে-আগে এদের প্রায় ৯৮ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা হতো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার যে গাফিলতি হয় সেই গাফিলতির কারণে ওই সময়কালে জন্ম নেওয়া শিশুরা আজ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে।’ স্বাস্থ্য খাতে আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে চলমান হামের টিকাদান কর্মসূচি বাতিলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘ফৌজদারি অবহেলা’ উল্লেখ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম নোটিশটি পাঠান। নোটিশ পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত চলাকালে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে। শত শত শিশুর করুণ মৃত্যু, তাদের মা-বাবার আর্তনাদ, হাজার হাজার শিশুর হাসপাতালে কাতরানোÑমানুষের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা চাই পুরো ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত হোক এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হোক।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button