জাতীয় সংবাদ

পৃথক সচিবালয়: আপিল বিভাগের রায়ের অপেক্ষায় সরকার

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে এখন আলোচিত হচ্ছে পৃথক স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। একদিকে সংসদে অধ্যাদেশ রহিত করার প্রস্তাব, অন্যদিকে তিন মাসের মধ্যে সচিবালয় বাস্তবায়ন করার রায় প্রকাশ। এ অবস্থায় বাদী পক্ষ রায় বাস্তবায়ন চায়। অপরদিকে সংসদে যাই হোক রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলছেন। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। পরের মাসে সচিবালয়ের উদ্বোধন করা হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ রহিত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এই অধ্যাদেশগুলো আপাতত আইনে পরিণত হচ্ছে না। পৃথক এ সচিবালয়ের জন্য একজন সচিব, ১৫ জন জুডিশিয়াল অফিসার এবং ১৯ জন স্টাফ ইতোমধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সংসদ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিতের প্রস্তাব করলেও অধস্তন আদালতের বিচারকরা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। পৃথক বিবৃতিতে আলাদা আলদা দিনে এমন কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, সপ্তদশ বিজেএস (বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস) ফোরাম ও ইয়াং জাজেস ফর জুডিসিয়াল রিফর্ম। এছাড়াও আইনজীবীরাও পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিতের প্রস্তাবে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তারা চান পৃথক সচিবালয়ের বাস্তবায়ন। এরই মধ্যে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির-সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের এমন বিধান বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। ফলে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হলো। একইসঙ্গে অধস্তন আদালতের জন্য ২০১৭ সালে করা শৃঙ্খলা বিধি বাতিল করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আপনারা জানেন এই রায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে, যদিও হাইকোর্ট ডিভিশন এই মামলাতে বেশ কয়েকটি ডিরেকশন দিয়েছেন, কিন্তু হাইকোর্ট নিজেই এই রায়টি যে চূড়ান্ত এটা মনে করেছেন বলে মনে হয়। কারণ আমাদের সংবিধানের ১০৩ এর ২ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা আছে, হাইকোর্ট যখন কোনো মামলা নিষ্পত্তি করে এবং সেই নিষ্পত্তির পরেও যদি সাংবিধানিক বিষয় জড়িত থাকে, তবে হাইকোর্ট একটি সার্টিফিকেট দেন যে মামলাটির সহিত সংবিধান ব্যাখ্যার বিষয়ে আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। এই রায়ের ১৮৪ পৃষ্ঠায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সার্টিফিকেট চাওয়া হয়েছে এবং আদালত তা মঞ্জুর করেছে। যেহেতু সংবিধানের ব্যাখ্যার প্রয়োজন এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ, তাই আমার মনে হয় এটা আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। সার্টিফিকেট দেওয়ার মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে যে এখানে আইনের ব্যাখ্যা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত। আমরা ইতোমধ্যে সার্টিফায়েড কপির জন্য দরখাস্ত দিয়েছি এবং দ্রুতই সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করব। অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, যেহেতু হাইকোর্ট ডিভিশন এখানে সার্টিফিকেট দিয়েছে, তাই আমরা সরাসরি আপিল দায়ের করব এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এই সাংবিধানিক প্রশ্নটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। যেহেতু বিষয়টি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে, আমাদের অভিমত হচ্ছে হাইকোর্ট বিভাগের এই রায়ের কার্যকারিতা এখন থেকে আসছে না। চূড়ান্ত বিবেচনার পরে কার্যকারিতা আসবে। ইতোমধ্যেই রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সরকারের কথা হয়েছে এবং তারা সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করবেন। তিনি আরও বলেন, এই চূড়ান্ত রায়টি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের এপ্রিলে। যদিও রায়টি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। কোনো রায় যখন ঘোষণা করা হয়, তখন থেকেই তার কার্যকারিতা শুরু হওয়ার কথা, কিন্তু আমরা দেখেছি চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, যা বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিবেচনাধীন আছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি আদালতের বিবেচনার বিষয়। আমরা একটি পদ্ধতি থেকে অন্য পদ্ধতিতে উত্তরণের পর্যায়ে আছি, তাই মাঝখানের কোনো ঘটনার কারণে বিচার বিভাগের কার্যক্রমে কোনো ধারাবাহিকতা ক্ষুণœ হবে না বলে আমি মনে করি। ‘আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে হাইকোর্ট বিভাগ যে সমস্ত ডিরেকশন দিয়েছে, যেমন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বিষয়গুলো, সেগুলো আলটিমেটলি সাংবিধানিক প্রশ্ন যা সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। এখানে কোনো শূন্যতা হওয়ার কারণ নেই। কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সবাই জুডিশিয়াল অফিসার। শিশির মনির বলেন, এ অধ্যাদেশ বাতিল করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। আমার অনুরোধ রায়ের আলোকে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অনিবার্য। এবং তিন মাসের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় কাজ করতে হবে। যখন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে তখন রায় প্রকাশ হয়নি। তারপরেও অধ্যাদেশের আলোকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর আপনারা এটাকে ধ্বংস করতে চাচ্ছেন। পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এখন রায়ের প্রতি আমরা মনে করি সরকার বলেন আর সংসদ বলেন সম্মান দেখাবেন শ্রদ্ধা দেখাবেন। এটি দেখিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ওপর অধস্তন আদালতের দায় দায়িত্ব ন্যস্ত করবেন। রাষ্ট্রপতির ওপরেও নয়, আপনাদের (সরকারের) ওপরেও নয়। আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের জন্য পৃথক সচিবালয় অনিবার্য। আপনারা এটাতে হাত দেবেন না, রায়কে মেনে নেবেন। রায়কে ব্যর্থ করবেন না। রায়ের যে নির্দেশনা আছে, এটা থেকে সরবেন না।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button