জাতীয় সংবাদ

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির আড়ালে ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতি

বিবিসি-রয়টার্সের প্রতিবেদন
# হরমুজ প্রণালিতে এক দিনে তিন জাহাজে গুলি ইরানের
দুটি জাহাজ জব্দ

প্রবাহ ডেস্ক : প্রবাহ ডেস্ক : নানা নাটকীয়তা ও হুঙ্কারের পর অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণাকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছেন না ইরানি কর্তৃপক্ষ। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির আড়ালে নতুন করে ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করলেও ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলে জানান ট্রাম্প। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের এই নৌ-অবরোধকে যুদ্ধের শামিল হিসেবে উল্লেখ করেছে। দেশটি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারাও হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ তুলে নিচ্ছে না। এই প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ার বার্তা দিয়ে জানান, ইরান চুক্তি না করলে যেকোনো সময় ইরানের ওপর হামলা হবে। সিএনবিসি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ফের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আমাদের সেনারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা তাসনিম এক প্রতিবেদনে জানায়, তেহরান ফের যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। সেই সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য ইরানি বাহিনী নতুন অনেকগুলো চমকের আয়োজন করেছে। তবে ইরানি বাহিনী নতুন সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য তাদের চমকে কী রেখেছে- তা নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি।
তাসনিম নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্ভাব্য যেকোনো নতুন যুদ্ধের শুরুতেই আমেরিকান ও ইসরাইলিদের জীবন আবার নারকীয় করতে ইরান প্রস্তুত।
তথ্যের বরাতে তাসনিম নিউজ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবি এবং নৌ অবরোধের কারণে ইরানের নতুন করে আলোচনায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই ফের যুদ্ধের জন্য ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত।
এদিকে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালিতে ফের উত্তেজনা বেড়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হরমুজে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া দুইটি জাহাজকে জব্দ করারও দাবি করেছে আইআরজিসি।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) বুধবার হরমুজে জাহাজে হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইউকেএমটিও বলেছে, প্রথম হামলাটি ওমানের ১৫ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে ঘটেছে। প্রথমে আইআরজিসির গান বোট জাহাজটির কাছে আসে এবং গুলি ছুড়ে। এতে জাহাজটির কমান্ড ডেকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে জাহাজের সকল ক্রু নিরাপদে আছেন।
আরেক জাহাজে হামলা হয়েছে ইরানের ৮ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে। সেখানে একটি কার্গো জাহাজে গুলি ছোড়া হয়। জাহাজটি এখন জলসীমায় আটকে আছে বলে জানিয়েছে ইউকেএমটিও।
ইউকেএমটিও নিশ্চিত করেছে, দ্বিতীয় এই জাহাজে হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং ক্রুরাও নিরাপদে আছেন।
বিবিসির বিশ্লেষণী রিপোর্ট বলছে, হরমুজ প্রণালিতে একই দিনে তিন জাহাজে হামলা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
এসব হামলার কারণে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে এবং উভয় দেশের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
সর্বশেষ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসমাইল বাঘেই বলেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের অনুরোধ বিবেচনা করছে তেহরান। বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম টেলিগ্রামে দেয়া পোটে তিনি লিখেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় ইরান সঠিক এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
অপরদিকে, ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালি পার হতে যাওয়া অন্তত তিনটি কনটেইনার জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র এবং যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। খবর রয়টার্সের।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রতিশোধ ও মার্কিন অবরোধের জবাবে ইরান ওই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি দিয়ে চলাচল করা জাহাজগুলো ইরানের বিপ্লবী গার্ড আইআরজিসির বার্তা না মানলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।
ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমানের উত্তর-পূর্বে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি কন্টেইনার জাহাজে গুলি ও রকেট-চালিত গ্রেনেড দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে জাহাজটির ওপরের অংশ বা ‘ব্রিজ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সব নাবিক নিরাপদে আছেন এবং এতে কোনো অগ্নিকা- বা পরিবেশগত ক্ষতি হয়নি।
জাহাজের ক্যাপ্টেন জানান, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একটি গানবোট তাদের জাহাজের কাছাকাছি আসে এবং পরে গুলি চালায়। গানবোটে তিনজন আরোহী ছিলেন।
গ্রিস-চালিত এই জাহাজের ক্যাপ্টেন দাবি করেন, হামলার আগে রেডিওর মাধ্যমে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। যদিও শুরুতে তাদের প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
ইউকেএমটিও আরও জানিয়েছে, ইরানের পশ্চিমে প্রায় ৮ নটিক্যাল মাইল দূরে আরেকটি কনটেইনার জাহাজের ওপর গুলি চালানো হয়। পানামা-নিবন্ধিত ওই জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং এর নাবিকরাও নিরাপদে আছেন।
আইআরজিসি বলেছে, জাহাজটিকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তা উপেক্ষা করে সেটি।
হরমুজে দুটি জাহাজ জব্দ করল ইরান : শান্তি আলোচনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও এর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হরমুজ প্রণালিতে দুটি কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, আজ বুধবার স্থানীয় সময় সকালে এই ঘটনা ঘটে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ-শাখা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আজ সকালে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় ‘আইন লঙ্ঘনকারী’ দুটি জাহাজকে শনাক্ত ও আটক করা হয়। আটককৃত জাহাজ দুটিকে বর্তমানে ইরানের উপকূলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি পানামার পতাকাবাহী ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ এবং অন্যটি লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘এপামিনোডাস’।
মেরিটাইম ট্র্যাকিং সাইট ‘মেরিন ট্রাফিক’ জানিয়েছে, জাহাজ দুটির সর্বশেষ অবস্থান ওমান থেকে উত্তর-পূর্বে ইরানি উপকূলের কাছাকাছি ছিল।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমান থেকে ১৫ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে একটি কন্টেইনার জাহাজকে লক্ষ্য করে আইআরজিসির বোট থেকে গুলি চালানো হয়। এতে জাহাজটির ব্রিজ (নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আট নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে ‘ইউফোরিয়া’ নামক তৃতীয় একটি কন্টেইনার জাহাজকে গুলি করে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থা ভ্যানগার্ড টেক।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে তেহরান ঘোষণা করেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ বা ত্যাগের জন্য অবশ্যই তাদের অনুমতি নিতে হবে। উল্লেখ্য, স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়েই পরিবাহিত হয়।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button