জাতীয় সংবাদ

ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে দেশ

দিশেহারা দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ
সংসদে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন
বন্ধ বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব ইউনিট

স্টাফ রিপোর্টার : গত তিন দিন ধরে লোডশেডিং বেড়েছে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায়। ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন খুলনাসহ এ অঞ্চলের মানুষ। সেই সঙ্গে বেড়েছে তাপদাহ। ফলে বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থী-পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। প্রচ- গরম আর লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে মানুষ। দিনে-রাতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে আর আসছে। এমনকি মধ্যরাতেও বিদ্যুতের সরবরাহ বন্ধ থাকছে বলেও অভিযোগ গ্রাহকদের।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ১৮২ মেগাওয়াট আর দুপুর ১টায় ছিল ১৫৮ মেগাওয়াট। এর আগে বুধবার (২২) দুপুরে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২০৩ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে ফিডার ভিত্তিক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলা, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা ও বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলাসহ মোট ২১ জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। এই ২১ জেলায় বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৩১৬ জন।
২১ জেলায় ওজোপাডিকোর আওতাধীন এলাকায় বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় ৭৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬১৯ মেগাওয়াট। এ সময় ঘাটতি ছিল ১৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এদিন দুপুর ১টায় ৮০১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬৪৩ মেগাওয়াট। আর ঘাটতি ছিল ১৫৮ মেগাওয়াট।
এর আগে বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুর ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮১০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬০৭ মেগাওয়াট, অর্থ্যাৎ লোডশেডিং ছিল ২১০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শুধুমাত্র খুলনা জোনে লোডশেডিং ছিল ১৫৫ মেগাওয়াট। এদিন খুলনায় ৬২৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪৬৮ মেগাওয়াট। আর বরিশাল জোনে লোডশেডিং ছিল ৪৮ মেগাওয়াট। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় খুলনাসহ ২১ জেলায় লোডশেডিং ছিল ১২৫ মেগাওয়াট।
খুলনা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, খুলনায় বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবার খুলনায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে চলমান তাপদাহের কারণে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুলনা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মো. মিজানুর রহমান। তাপদাহ চলছে। যে কারণে গরম বেশি। শুক্রবারও তাপদাহ থাকবে। তবে আগামী ২৫ বা ২৬ এপ্রিল খুলনায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
নগরীর খালিশপুর এলাকার এইচএসসি পরীক্ষার্থী শানু বলেন, তিন মাস পর এইচএসসি পরীক্ষা। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে ও রাতে লেখাপড়ায় সমস্যা হচ্ছে। একে গরম তার ওপর বিদ্যুৎ যাচ্ছে আর আসছে। রাতেও প্রচন্ড গরম থাকে। পড়তে বসা যায় না। অবশ্য এটি বৈশ্বিক সমস্যা। তবে এটি তদারকি করা প্রয়োজন।
খুলনার ডুমুরিয়ার আরশনগর গ্রামের নূরজাহান খাতুন বলেন, প্রচ- রোদ। অসহ্য গরম। সেই সঙ্গে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরে থাকা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করে। বিদ্যুৎ যাওয়ার পরে এক বা দেড় ঘণ্টা আসে। ঘণ্টাখানেক থাকে, আবার চলে যায়। দিনে-রাতে ৮ থেকে ১০বার বিদ্যুৎ থাকে না। এভাবে বিদ্যুৎ যাওয়ার জন্য গরমে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। এছাড়াও ইলেক্ট্রনিকস পণ্য নষ্ট হচ্ছে। ফ্রিজে থাকা খাবারও নষ্ট হচ্ছে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকে কর্মরত মো. মাহাফুজ বলেন, সকালে যথারীতি অফিসে এসেছি। তবে দুপুর পর্যন্ত এরই মধ্যে তিনবার বিদ্যুৎ চলে গেছে। প্রতিবারই কাজের মধ্যে বিঘœ ঘটছে। যখন বিদ্যুৎ থাকে তখন এসি চালু থাকে, ফলে কিছুটা স্বস্তিতে কাজ করা যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে অফিসের ভেতরটা প্রচ- গরম হয়ে ওঠে, বসে কাজ করাটা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এভাবে বারবার ঠান্ডা ও গরমের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে শরীরের ওপর প্রভাব পড়ছে।
ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী (এনার্জি, সিস্টেম কন্ট্রোল অ্যান্ড সার্ভিসেস) মো. আব্দুল মজিদ বলেন, গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে লোডশেডিং বেড়েছে। বিদ্যুতের সরবরাহ কম পাচ্ছি, তাই কম দিচ্ছি। বৈশ্বিক অবস্থার কারণে জ্বালানি সংকটে এই সমস্যা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুন মাসে ৮০৯ মেগাওয়াট চাহিদা ছিল। আর বুধবার দুপুর ১টায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৮১০ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার ১৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি সংকট নিরসনে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন : জ্বালানি সংকট নিরসনে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। সরকারি দলের ৫ জন এবং বিরোধী দলের ৫ জন সংসদ সদস্যদের নিয়ে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে বিরোধীদল। শিগগিরই তারা ৫ জন সদস্যের তালিকা দেবে বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে। বুধবার জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাব দেন এবং সরকারি দলের ৫ জন সদস্যের নাম জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সকলেই আলোচনা করে একমত হয়েছিলাম বা একটি বিষয়ে আমরা সকলেই উপনীত হয়েছিলাম। এটি একটি বৈশ্বিক প্রবলেম, সারা বিশ্বেই এই সমস্যায় উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। মাননীয় বিরোধী দলীয় নেতা উনার বক্তব্যে বাংলাদেশের এটি যে কনসার্ন, সেটি এক্সপ্রেস করেছিলেন। প্রস্তাব দিয়েছিলেন উনাদের কাছে কিছু পরামর্শ আছে। সরকারি দল এবং বিরোধী দল আমরা একসঙ্গে সেই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে পারি।
তিনি বলেন, আমি আমার বক্তব্যে বলেছিলাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সকল সময় দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে যেকোনো আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছেন। তারই প্রেক্ষাপটে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করছি। আমি বিরোধী দলীয় নেতাকে অনুরোধ করব, উনারাও যদি ৫ জনের নাম দেন, তাহলে এই ১০ জন বসে এই বিষয়গুলোর উপর আলোচনা করতে পারেন। কোন পরামর্শ থাকলে এই কমিটির মাধ্যমে সেটি সরকারের কাছেও আসলো। সরকার সেটার মধ্যে কোন বাস্তবতা থাকলে অবশ্যই সেটি কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
তারেক রহমান বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, মইনুল ইসলাম খান শান্ত, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু এই ৫ জনের নাম উপস্থাপন করছি। আমি বিরোধী দলীয় নেতাকে অনুরোধ করব, উনাদের পক্ষ থেকে নামগুলো যদি দ্রুত আমাদের কাছে দেন, তাহলে এই কমিটি দ্রুত কাজ শুরু করতে পারবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবে নেয়ার জন্য। আমরা আশা করি- এই সংসদ জাতীয় সকল সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা মনে করি এই সংসদের জন্য এটি একটি নবযাত্রা। এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা শিগগিরই ইনশাআল্লাহ নামগুলো পেশ করব।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল এক থাকলে যে কোনো সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ : দিনাজপুরের পাবতীপুর বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে সচল ১ নম্বর ইউনিটটির উৎপাদন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। বুধবার (২২ এপ্রিল) রাত ১০টা ১০ মিনিটে ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ১ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়েছে দিনাজপুরসহ উত্তরের আট জেলা।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, কয়লার সঙ্গে পাথর আসায় ১ নম্বর ইউনিটের বয়লার পাইপ ফেটে ও কুলিং ফ্যান ভেঙ্গে গেছে। এতে বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন।
তিনি আরও বলেন, মেরামত কাজ চলছে। মেরামত করে আবার উৎপাদন শুরু করতে ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগতে পারে।
এর আগে দীর্ঘদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ২ নম্বর ইউনিট এবং ২৭৫ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিট।
এদিকে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও উত্তরাঞ্চলের চাহিদা পূরণে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, অন্যদিকে সরবরাহে ঘাটতি। এতে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। জাতীয় গ্রিড থেকেও মিলছে না চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button