মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা

বোমা তৈরিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের
কুয়েতের চীনা বন্দর প্রকল্পে ইরানের হামলা
আমিরাতে ইসরায়েলি ‘আয়রন ডোম’ মোতায়েন
প্রবাহ ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়েতের একটি কৌশলগত দ্বীপে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে দেশটির সরকার। বুবিয়ান নামের ওই দ্বীপে চীন একটি বিশাল বন্দর নির্মাণে সহায়তা করছে। এই হামলার খবরের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ মোতায়েনের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
কুয়েতের অভিযোগ: কুয়েত সরকারের দাবি, গত ১ মে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের একটি দল পারস্য উপসাগরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বুবিয়ান দ্বীপে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। দ্বীপটিতে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের আওতায় ‘মুবারক আল কবির’ বন্দর নির্মাণাধীন রয়েছে। কুয়েতি নিরাপত্তা বাহিনী এই হামলা নস্যাৎ করে দিয়ে চারজনকে আটক করেছে, যদিও দুইজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এই অভিযানে কুয়েতের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
আমিরাতে ইসরায়েলি সেনা ও অস্ত্র: এদিকে, ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক সম্মেলনে নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানের হুমকি মোকাবিলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠিয়েছে ইসরায়েল। এর সাথে এই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। এটিই প্রথমবারের মতো আরব আমিরাতের মাটিতে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
বৃহত্তর অস্থিরতা ও বৈশ্বিক প্রভাব: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের ঠিক আগমুহূর্তে এই অভিযোগ সামনে এলো। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে ইরান ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। কারণ, ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের এই দ্বন্দ্বে হরমুজ প্রণালী সংকটে পড়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্রতর হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাহরাইনও তাদের দেশে ইরানি মদদপুষ্ট গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ২৪ জনকে কারাদ- দিয়েছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান বনাম ইসরায়েল-আরব দেশগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ এখন প্রকাশ্য সংঘাতের রূপ নিচ্ছে।
বোমা তৈরির মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের : ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আবার হামলার শিকার হলে তারা ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ করার পথে যেতে পারে।
আবারো হামলার শিকার হলে ইরান সরাসরি পারমাণবিক বোমা তৈরির উপযোগী বা ৯০ শতাংশ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির এক প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা।
মঙ্গলবার ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানান, যদি ইরানের ওপর আবারো আক্রমণ চালানো হয়, তবে সংসদ এই উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
মঙ্গলবার রয়টার্স দুবাই থেকে আরো জানিয়েছে, বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি এক নাজুক পরিস্থিতির মুখে রয়েছে।
গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর মন্তব্য করেছেন যে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন অনেকটাই মৃতপ্রায়।
এর আগে গত জুন মাসে ১২ দিনব্যাপী এক যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। সেই হামলায় তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছিল। তবে বর্তমানে ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। কারিগরি দিক থেকে এই মাত্রার ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশ বা অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া খুবই সামান্য সময়ের ব্যাপার।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, যতক্ষণ না উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ এই ইউরেনিয়ামের মজুদ ইরান থেকে সরানো বা ধ্বংস করা হচ্ছে, ততক্ষণ তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বড় বাধা দেয়া সম্ভব নয়।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সঙ্ঘাত মেটাতে দু’দেশের মধ্যে আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে এই পারমাণবিক ইস্যু। ওয়াশিংটন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরানকে অবশ্যই তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে। তবে তেহরান এই শর্ত মানতে নারাজ। তারা চায় পারমাণবিক-সংক্রান্ত আলোচনাগুলো চুক্তির পরবর্তী ধাপে হোক। কূটনৈতিক এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে আসা এমন সরাসরি হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলছে।


