সাতক্ষীরায় নিহতদের পরিবারে শোকের ছায়া : আহাজারি

# লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশি
বদিউজ্জামান ও বাবুল হোসেন, সাতক্ষীরা : লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার দুই বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁদের পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জীবিকার সন্ধানে মাত্র মাসখানেক আগে বিদেশে পাড়ি জমানো এই দুই যুবকের আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
নিহতরা হলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৩৮) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের মো. নাহিদুল ইসলাম (২৬)। শফিকুল ইসলাম ওই গ্রামের আফসার আলীর একমাত্র ছেলে এবং নাহিদুল ইসলাম আব্দুল কাদেরের ছেলে।
বৈরুতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুরে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন গ্রামে তাঁদের আবাসস্থলে ইসরায়েলি বাহিনী ড্রোন হামলা চালায়। এতে শফিকুল ও নাহিদুল ছাড়াও এক সিরীয় নাগরিক নিহত হন। বর্তমানে তাঁদের মরদেহ নাবাতিয়েহর নাবিহ বেররী হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন স্বাক্ষরিত এক শোকবার্তায় এ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। জানা গেছে, ওই এলাকায় এটি ছিল ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বিতীয় দফা হামলা। এর আগে জেবদিন পৌরসভার একটি রুটি বহনকারী ভ্যানে পৃথক ড্রোন হামলায় আরও দুই স্থানীয় বাসিন্দা নিহত হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে অনেক স্বপ্ন নিয়ে গত ২০ রমজান লেবাননে পাড়ি জমান শফিকুল ও নাহিদুল। বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলের চেষ্টা শুরুর আগেই তাঁদের এমন করুণ মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
শফিকুলের প্রতিবেশী ও ভালুকা চাঁদপুর মডেল হাইস্কুলের শিক্ষক আল কালাম আবু ওয়াহিদ জানান, শফিকুল ছিলেন তাঁর মা-বাবার একমাত্র সন্তান। সংসারের হাল ধরতে ঋণ করে তাঁকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন পরিবার। হঠাৎ এমন মৃত্যুসংবাদে তাঁর বাবা-মা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, “অনেক আশা নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল শফিকুল। পরিবারের সুদিন ফেরানোর লড়াই শুরু হওয়ার আগেই এভাবে চলে যাওয়া খুবই মর্মান্তিক।”
ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, “দুই পরিবারই অত্যন্ত অসহায়। ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এখন সন্তান হারিয়ে তাঁরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, অর্থনৈতিকভাবেও নিঃস্ব হয়ে গেছেন।”
উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন ও ইসরায়েল এর মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে দেশটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৮৬৯ জন নিহত হয়েছেন।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিহত দুই পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ গেল আশাশুনির নাহিদের : এদিকে, আশাশুনি (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি বাবুল হোসেন জানান, পরিবারকে সুস্থ ও সচ্ছল রাখার স্বপ্ন নিয়ে মাত্র দুই মাস আগে ঋণ করে সুদূর লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের যুবক মো. নাহিদুল ইসলাম নাহিদ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসÑইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়ে চিরদিনের জন্য থেমে গেল তার স্বপ্নযাত্রা।
লেবাননের বৈরুতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) ও দূতালয় প্রধান মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত শোকবার্তায় জানা গেছে, আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদের ও নুরুন্নাহার খাতুন দম্পতির ছেলে মো. নাহিদুল ইসলাম গত ১১ মে দুপুর ১২টার দিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়ে জেলার যেব্দীন এলাকায় নিজ বাসায় অবস্থানকালে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন। বর্তমানে তার মরদেহ নাবাতিয়ের নাবিহ বেররী হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
নাহিদের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছানোর পর থেকেই কাদাকাটি গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের আর্থিক উন্নতির আশায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মাত্র দুই মাস আগে লেবাননে যান নাহিদ। তার মৃত্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবার। একইসঙ্গে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঋণের বোঝা পরিশোধের দুশ্চিন্তাও এখন তাদের সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিহত নাহিদের বাবা আব্দুল কাদের কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নাহিদ ছিল সবার বড়। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে সে বিদেশ যেতে চাইত। আমি অনেকবার বাধা দিয়েছি। টাকার অভাবে পাঠাতেও পারিনি। পরে অনেক কষ্টে ঋণ করে তাকে লেবাননে পাঠালাম। কে জানত, আমার ছেলে আর জীবিত ফিরে আসবে না।”
নাহিদের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তার গ্রামের বাড়িতে ছুটে যান আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুন্ডুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এসময় ইউএনও শ্যামানন্দ কুন্ডু উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন,
“নাহিদের মরদেহ যেন দ্রুত পরিবারের কাছে পৌঁছানো যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকারিভাবে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।”



