ড. ইউনূস সরকারের মুখোশ উন্মোচন করলেন মাহফুজ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ সাবেক অর্ন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের এক ফেসবুক পোস্টে রাজনৈতিক অঙ্গনে রীতিমতো ভূমিকম্প হয়েছে। এ ফেসবুক পোস্টে তিনি যতটা না নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নিয়ে লিখেছেন তার চেয়ে বেশি ড. ইউনূসের অর্ন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছেন। মাহফুজ আলমের এ পোস্টটি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে বোঝা যাবে ইউনূস সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা, দুর্নীতি এবং অপশাসনের চিত্র। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে আওয়ামী লীগের ফেরার কথা বলে মাহফুজ আসলে ইউনূস সরকারের মুখোশ উন্মোচন করেছেন। ইউনূস সরকারের বিদায়ের পর বিভিন্ন মহল তাঁর নানান কর্মকা-ের সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে হামের টিকা প্রদানে অবহেলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সারা দেশ সমালোচনায় মুখর। কিন্তু ইউনূস সরকারের একজন উপদেষ্টা এই প্রথম ওই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললেন, যিনি অর্ন্তর্বর্তী সরকারের অংশ ছিলেন। তা ছাড়া এর আগে কেউ ইউনূস সরকারের আদর্শিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। মাহফুজ আলম ইউনূস সরকারের নৈতিক এবং আদর্শিক অবস্থান নিয়ে কথা বললেন। তাঁর এ পোস্টটি বুঝিয়ে দিল, কেন ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘ এ পোস্টে মাহফুজ যা লিখেছেন তা ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। এ পোস্টের প্রতিটি অংশই ব্যাখ্যার দাবি রাখে। মাহফুজ তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ’২৪-কে ’৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি।’ ইউনূস সরকার এবং তাঁর কয়েকজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা ক্ষমতা নেওয়ার পরই ’৭১-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা ভাঙচুর, মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা ছিল ইউনূস শাসনের দেড় বছরের চিত্র। ড. ইউনূসের জাতির উদ্দেশে ভাষণে ’৭১ এবং মুক্তিযুদ্ধকে রীতিমতো অবহেলা করা হয়েছিল। এটা যে দেশের মানুষ পছন্দ করেনি তা মাহফুজের লেখায় স্পষ্ট। এ পোস্টের বিশদ ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় ইউনূস সরকার ছিল মুখোশে ঢাকা স্বাধীনতাবিরোধী। পরের অংশে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে মাহফুজ লিখেছেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থিদের উত্থানের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেসে।’ এই প্রথম ইউনূস সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা স্বীকার করেছেন ইউনূস সরকারের যাবতীয় অপকর্ম এবং ব্যর্থতা। তিনি তাঁর পোস্টে মিডিয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর হামলা, ঐকমত্য কমিশনের জনবিচ্ছিন্নতা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিচার অঙ্গনে দলীয় লোকদের বসানো, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য (সংঘতন্ত্র) এ রকম অন্তত দুই ডজন বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁর এ পোস্টটি একজন হতাশ পরাজিত বিপ্লবীর আত্মকথন। এ পোস্টের পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।। এ পোস্ট কেন্দ্র করে কেউ কেউ অর্ন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কারও কারও বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ সামনে এনেছেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, মাহফুজ আলম এখন যে অর্ন্তর্বতী সরকারের সমালোচনা করছেন, সেই সরকার থেকে তাহলে তখন তিনি কেন সরে দাঁড়াননি? মাহফুজের ওই পোস্টের নিচে বেশ কয়েকজন মন্তব্যও করেছেন। শাহবাগ থানার সামনে মাইকে ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর কর্মসূচি কেন্দ্র করে দুই মাস জেলে থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া শামসুন নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ (ইমি) মন্তব্যের ঘরে লিখেছেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করসে, যেদিন ৩২ ভাঙতে গেসিলা। লীগ সেদিনই ব্যাক করসে যেদিন এনসিপির কারণে গোপালগঞ্জে ৫ খুন হয়। এই দুইটা পয়েন্ট বাদ পড়সে।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা আবু বাকের মজুমদার লেখেন, ‘উপদেষ্টাদের কারও কারও অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়টা মিস (উল্লেখ করা হয়নি) গেছে ভাই। ওইটা যদি একটু অ্যাড (যোগ করা) করতেন।’ গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ মাহফুজের পোস্টে মন্তব্যে লেখেন, ‘যে ইন্টেরিমের সমালোচনা এখন করছেন, তখন যখন আপনি নিজেও এই সরকারের অংশ ছিলেন, আপনি পদত্যাগ করেন নাই কেন-এইটার জবাবও কিন্তু পাওনা। যখন দেখলেন ইন্টেরিম উগ্র ডানপন্থিদের পেট্রন (পৃষ্ঠপোষকতা) করছে, তখন তো আটকাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়েই সততার সাথে ইন্টেরিম থেকে সরে যেতে পারতেন। সেটা না করে আপনি আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইছেন।’ মাহফুজ আলম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তাত্ত্বিক নেতা মনে করা হয় তাঁকে। এজন্য তিনি থাকতেন পর্দার আড়ালে। ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের আগে তাঁর তেমন পরিচিতি ছিল না, যেমন ছিল নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম কিংবা আসিফ মাহমুদের। মাহফুজ আলমকে প্রথমে কাছে টেনে নেন ড. ইউনূস। তাঁকে বানানো হয় বিশেষ সহকারী। কদিন পর মাহফুজ দপ্তরবিহীন উপদেষ্টা এবং নাহিদ ইসলামের পদত্যাগের পর তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ছাত্রনেতাকে পাদপ্রদীপে আনেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস নিজেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি অনুষ্ঠানে মাহফুজ আলমকে ইউনূস জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু দ্রুতই ইউনূস এবং প্রভাবশালী উপদেষ্টাদের সঙ্গে মাহফুজের দূরত্ব তৈরি হয়। এখন এ পোস্ট থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং গণ অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী ড. ইউনূস দেশ পরিচালনা করেননি। বরং ছাত্রদের ব্যবহার করে ইউনূস তাঁর নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। দেড় বছরে ইউনূস যখন যাকে প্রয়োজন তাকে ব্যবহার করেছেন। কাজ শেষে তাকে টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। মাহফুজ আলমের পোস্ট পড়ে আমার মনে একটাই প্রশ্ন-ইউনূস কি তাহলে জুলাই আন্দোলন এবং শহীদদের রক্তের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন?



