স্থানীয় সংবাদ

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ উপলক্ষে খুলনায় মানববন্ধন

স্টাফ রিপোর্টার ঃ গুম মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিকভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। এছাড়া এখনও গুম থাকা ব্যক্তিদের তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। আর তারা জীবিত না থাকলেও সেটিও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের পরিবারকে জানাতে হবে। এটি করতে ব্যর্থ হলে দেশে আবারও ফ্যাসিবাদি শাসন ব্যবস্থা কায়েম হবে এবং গুমের সাংস্কৃতি ফিরে আসবে। দেশের অন্যতম শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ খুলনা ইউনিট আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে সরকারের কাছে এসব দাবি জানানো হয়। ‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ’ উপলক্ষে আজ শনিবার (২৩ মে) সকাল ১০ টায় খুলনা প্রেস ক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব ও সপ্তাহের বিবৃতি পড়ে শোনান ‘অধিকার’ খুলনা ইউনিটের ফোকাল পার্সন সাংবাদিক মুহাম্মদ নূরুজ্জামান। সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী কে.এম. জিয়াউস সাদাত। মানববন্ধনে বক্তারা আরও বলেন, স্বাধীন দেশে এমন কথা ছিল না যে গুমের বিরুদ্ধে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে হবে, জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। বক্তারা গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে গুম হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং এর সাথে জড়িত পতিত শেখ হাসিনাসহ তার দোসরদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়। মানববন্ধনে পাঠকৃত অধিকার’র বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে শুমকে ব্যবহার করেছে। পতিত হাসিনা সরকারের শাসনামলে সারা দেশে বেআইনীভাবে আটক রাখার বন্দিশালা তৈরি করা হয়। এই সব অবৈধ গোপন বন্দিশালায় বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং তথাকথিত “জঙ্গিদের” আটক করে রাখা হতো। এরমধ্যে আলোচিত গোপন বন্দিশালা হলো ডিজিএফআই এর জয়েন্ট ইন্টারগেশন সেন্টার এবং র‌্যাবের টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন সেন্টার। এই বন্দিশালাগুলোতে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরোধীতাকারী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে মূলত যাঁরা সোচ্চার ও প্রতিবাদী হতেন গুম করে নির্যাতন করা হতো। এছাড়াও অনেককে আটকের পর ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে নির্যাতনের পর সন্ত্রাস বিরোধী মামলাসহ বিভিন্ন মিথ্যা বানোয়াট মামলায় আসামি করা হয়। আজ অবধি ফেরত না আসা ভিক্টিমদের পরিবার সরকার প্রতিশ্রুত সার্টিফিকেট না পাওয়ায় তাঁরা ভিক্টিমের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ব্যবহার ও হস্তান্তরের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পরিবারগুলো এখনও তাঁদের প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। ফেরত আসা অনেক গুমের শিকার ব্যক্তি হয়রানীমূলক মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে বছরের পর বছর আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। এছাড়া গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি ফিরে আসেননি তাঁদের পরিবারের সদস্যরা আজ চরম অনিশ্চয়তায় জীবন পার করছেন। এ অবস্থায় মানববন্ধন থেকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ আইনে পরিণত করার জোর দাবি জানানো হয়। মানববন্ধনে অধিকার’র পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবী তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হচ্ছে- অবিলম্বে গুম প্রতিরোধ আইন জাতীয় সংসদে পাশ করতে হবে। যে সমস্ত গুমের শিকার ব্যক্তির এখনও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি, তাঁদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অধিকার ভোগ করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। গুমের পর কিছু ব্যক্তিকে ভারতীয় ীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভারতের কারাগারে বন্দি থাকার পর ফিরে এসেছেন। তাই ভারতের কারাগারে বাংলাদেশী আরো গুমের শিকার ব্যক্তি আছেন কি-না সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারের সাথে কূটনৈতিক পর্যায়ের যোগাযোগ স্থাপন করে তা জানতে হবে। যে সমস্ত ব্যক্তি গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বা নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে তাঁদেরকে অবিলম্বে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে হবে এবং গুমের সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চি করতে হবে। কোন রকম দায়মুক্তি দেয়া চলবে না। মানববন্ধনকালীন সমাবেশে বক্তৃতা করেন- বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহকারী মহাসচিব ও আমার দেশ-এর খুলনা ব্যুরো প্রধান এহতেশামুল হক শাওন, বিএফইউজের সাবেক সহ-সভাপতি, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার সভাপতি ও মানবজমিনের ব্যুরো প্রধান মো. রাশিদুল ইসলাম, খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাড. বাবুল হাওলাদার, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনার সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রানা, ব্লাষ্ট খুলনা শাখার উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট অশোক কুমার সাহা, ছায়াবৃক্ষের প্রধান নির্বাহী মাহবুব আলম বাদশা, মানবাধিকার কর্মী শেখ আব্দুল হালিম ও খুলনা জেলা ব্লাড ব্যাংকের সভাপতি শেখ ফারুক। উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা জেলা শাখার কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম, চ্যানেল ওয়ান’র খুলনা ব্যুরো প্রধান সোহেল মাহমুদ, প্রধান শিক্ষক মো. রবিউল ইসলাম, খুলনা জেলা ব্লাড ব্যাংকের সহ-সভাপতি এস এম সোরহাব হোসেন, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক মিশারুল ইসলাম মনির, আবু হারুনর রশীদ, অ্যাডভোকেট মো. শহিদুল ইসলাম, অধিকার’র হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার সাংবাদিক এম এ আজিম, গুম থেকে ফিরে আসা খুলনার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. ইমরান হোসেন, সাংবাদিক মো. রায়হান মোল্লা, সাকিল আহমেদ, জি এম রাসেল, মো. মোস্তফা কামাল রিপন, সোহেল আহমেদ, শিক্ষক মাহবুবুল হক, ইমরান হোসেন, আসাদুর রহমান নান্না, মানবাধিকার কর্মী স্নিগ্ধা সুলতানা মুন্নি, পাপিয়া খাতুন, নাবা আক্তার শারমিন, বুশরা আমেনা প্রমুখ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button