স্থানীয় সংবাদ

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঘটনায় তদন্ত শুরু : সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের

স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্স স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক মো. হাবিবুল্লাহ এবং নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রোহানকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত একটি ঘটনাকে ঘিরে বিদ্যালয় ও অভিভাবক মহলে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীর পিতা আনোয়ার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক মো. হাবিবুল্লাহকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা জানতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ ও তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।
অভিযোগকারী আনোয়ারুল ইসলাম যিনি নিজেও একজন শিক্ষক তিনি ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে সমাধান প্রত্যাশা করেছেন। তিনি মনে করেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে সকল পক্ষের জন্য ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীও বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মতামত দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যে ঘটনার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত সামনে আসায় তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হুমাইরা আফরিন লাবণ্য বলেন, আমি যতদিন স্যারকে দেখেছি, তিনি আমাদের নিয়মিত পড়াশোনার বিষয়ে খুবই আন্তরিক। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল এবং শৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি সবসময় গুরুত্ব দেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি স্যারের কাছ থেকে কখনও খারাপ আচরণের শিকার হইনি। তাই আমরা চাই বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত হোক এবং প্রকৃত ঘটনা সামনে আসুক।

নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহাদ বলেন, রোহান কাউকে গালাগালি করতে পারলে সে নিজেকে বড় মনে করে। হাবিবুল্লাহ স্যার আমাদের পড়ালেখার ব্যাপারে খুবই যতœশীল। তবে আমরা চাই বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হোক।

নবম শ্রেণির ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থী তাজিম বলেন, স্যারকে আমরা একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক হিসেবেই জানি। স্কুলের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি সবসময় কাজ করেন। তাই বিষয়টি নিয়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও শ্রেণি শিক্ষক মেহেদী হাসান বলেন, বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের অভিভাবকদের কিছুদিন আগে ডেকে আলোচনা করা হয়েছে। ওই আলোচনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী রোহানও ছিল।

অভিযুক্ত শিক্ষক মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, আমার উদ্দেশ্য ছিল রোহানকে শাসন করা এবং সঠিক পথে আনার চেষ্টা করা। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীর আচরণ সংশোধন করার দায়িত্ববোধ থেকেই আমি তাকে কয়েকটি চড় মেরেছি। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছি এবং সবসময় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও শৃঙ্খলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছি।

এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্স স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্তের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, অনেক অভিভাবক আমাদের কাছে এসে বলেন, তাদের সন্তানদের যেন আমরা শাসন করি। শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও সঠিক পথে রাখার জন্য শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাসনের বিষয়টি সবাই একইভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। এ ঘটনায়ও হয়তো অভিভাবকের সঙ্গে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে। আমি বিষয়টি নিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, কয়েকদিন আগে আমাদের বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর কাছে লাঞ্ছিত হয়েছেন। আমরা শিক্ষকরা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের ভুল-ত্রুটি সন্তান হিসেবে বিবেচনা করে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখি। তবে কোনো ঘটনায় যেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি আমাদের সবার দায়িত্ব।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের সুনাম, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক সম্মান এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে বলে আমরা আশা করছি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং শিক্ষার অনুকূল পরিবেশের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ ধরনের কোনো অভিযোগ সামনে এলে তা আবেগ, গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার ভিত্তিতে নয়; বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতন মহল মনে করছে, তদন্ত চলাকালে শিক্ষক মো. হাবিবুল্লাহ, শিক্ষার্থী রোহান, অভিযোগকারী আনোয়ারুল ইসলাম এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সকলের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা, দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত সম্পন্ন হবে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হওয়ার পাশাপাশি এমন একটি সমাধান আসবে, যা বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক আস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক পরিবেশ অটুট রাখতে সহায়ক হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button