স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় ডেঙ্গুর বিস্তার: দায় শুধু মশার নয়, আমাদেরও – : ডা. গাজী মিজানুর রহমান চিকিৎসক, সমাজ সেবক।

খুলনা শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে খুলনা বিভাগে ৭৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ডেঙ্গু কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়। এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত সচেতনতার সম্মিলিত পরীক্ষার ফল। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু “ডেঙ্গু কেন বাড়ছে?” নয়, বরং “আমরা কোথায় ব্যর্থ হচ্ছি এবং কীভাবে তা প্রতিরোধ করতে পারি?” কেন খুলনায় ডেঙ্গু বাড়ছে? ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা। এই মশা সাধারণত স্বচ্ছ, জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। বর্ষাকালে খুলনা শহরে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল, টায়ার, ফুলের টব, পানির ট্যাংক কিংবা নালা-নর্দমার বিভিন্ন স্থানে এডিসের প্রজননস্থল তৈরি করতে পারে।খুলনার ক্ষেত্রে দ্রুত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে যিড়-ও উল্লেখ করেছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ হবে না। এডিস মশার একটি বড় অংশের প্রজননস্থল তৈরি হয় আমাদের নিজেদের বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, অফিস, দোকান, নির্মাণস্থলে ও খোলা ড্রেনে। অর্থাৎ, মশা যেমন আছে, তেমনি আছে মশার জন্য তৈরি করা আমাদের পরিবেশ।নাগরিকের দায়িত্ব কোথায়?ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রত্যেক নাগরিককে সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজের বাড়ি ও আশপাশে “১০ মিনিটের মশা অনুসন্ধান” করতে হবে। কোথাও পানি জমে আছে কি না দেখুন।ফুলের টব ও টবের নিচের ট্রে পরিষ্কার রাখুন।ডাবের খোসা, বোতল, ক্যান, পুরোনো টায়ার ও প্লাস্টিকের পাত্র ফেলে রাখবেন না।পানির ট্যাংক ও অন্যান্য পানির পাত্র ঢেকে রাখুন।নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করুন।ছাদ, বারান্দা ও বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখুন।নিজের বাড়ি পরিষ্কার করার পাশাপাশি পাশের বাড়ি ও খালি জায়গার বিষয়েও নজর দিন।দিনের বেলায়ও মশার কামড় থেকে বাঁচতে প্রয়োজনে মশারি, রিপেলেন্ট ও উপযুক্ত পোশাক ব্যবহার করুন।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান ব্যবস্থা হিসেবে নির্দেশনা দিয়েছে।সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব আরও বড়। নাগরিকের দায়িত্ব আছে, কিন্তু নাগরিককে একা রেখে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। খুলনা সিটি কর্পোরেশনকে নেতৃত্ব দিতে হবে।বর্তমানে কে সি সি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে, যার মধ্যে মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম রয়েছে। তবে কার্যক্রম যেন শুধু ডেঙ্গুর মৌসুমে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রয়োজন সারা বছর ধরে পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি।বিশেষ করে:১। নিয়মিত লার্ভাল সোর্স চিন্হিতকরন:কোন ওয়ার্ডে কোথায় এডিসের প্রজনন বেশি হচ্ছে, তার তথ্যভিত্তিক মানচিত্র তৈরি করতে হবে।২। সোর্স হ্রাস কর্মসূচি:শুধু ফগিং নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।৩। নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত জায়গা নজরদারি:এসব স্থানে নিয়মিত পরিদর্শন এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।৪। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা: প্লাস্টিক, ক্যান, টায়ার ও অন্যান্য পানি ধারণকারী বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করতে হবে।৫। ওয়ার্ডভিত্তিক জবাবদিহি: প্রতিটি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব, প্রজননস্থল এবং ডেঙ্গু রোগীর তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা যেতে পারে।৬। নাগরিক অংশগ্রহণ:শুধু সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা নয়, কাউন্সিলর, বাড়ির মালিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার কমিটি, মসজিদ-মাদ্রাসা, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত করতে হবে।ফগিং কি সমাধানের একমাত্র পথ? না। ফগিং প্রাপ্তবয়স্ক মশা কমাতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটি মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের বিকল্প নয়।আজ ফগিং করলাম, কিন্তু বাড়ির ছাদে বা পাশের নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে রইল, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই আবার মশার সংখ্যা বাড়তে পারে।তাই মূল মন্ত্র হওয়া উচিত:“মশা মারার চেয়ে মশার জন্ম বন্ধ করা বেশি জরুরি।”ডেঙ্গু হলে কী করবেন?জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার অবহেলাও করা যাবে না। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে প্রচ- মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি, দুর্বলতা, রক্তপাত বা পেটের তীব্র ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।ডেঙ্গু সন্দেহ হলে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে এসপিরিন বা আইবুপ্রফেন জাতীয় ঔষধ এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।শেষ কথা ডেঙ্গুর জন্য শুধু মশাকে দায়ী করলে আমরা সমস্যার অর্ধেকই বুঝব।সিটি কর্পোরেশনকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে, নাগরিককেও তার দায়িত্ব নিতে হবে।একটি পরিচ্ছন্ন বাড়ি, একটি পরিষ্কার ছাদ, একটি উল্টে রাখা ফুলের টব, একটি সরিয়ে ফেলা ডাবের খোসা, একটি ঢেকে রাখা পানির ট্যাংক হয়তো একটি এডিস মশার জন্ম বন্ধ করতে পারে। আর একটি মশার জন্ম বন্ধ করা মানে একটি পরিবারের ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো।ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি পুরো শহরের সম্মিলিত দায়িত্ব।খুলনাকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখতে সিটি কর্পোরেশন করবে তার কাজ, নাগরিক করবে তার কাজ।আমাদের সম্মিলিত সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button