খুলনায় ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা : ২৪ ঘণ্টায় ১৭৩ ভর্তি : খুমেকে ৭ দিনে ৬ মৃত্যু

# রোগীর ঢল খুমেকে : প্রতিদিন ভর্তি থাকছে ১৪০-১৫০ জন
# নগরীর ৪টি ওয়ার্ড রেড জোন : ২২, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে #
# পরিস্থিতির অবনতি হলে বয়রা ডায়াবেটিক হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ড
কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত সাত দিনে খুমেক হাসপাতালে ডেঙ্গুতে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ অবস্থায় রোগীর চাপ সামাল দিতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে নগরীর বয়রা ডায়াবেটিক হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গুওয়ার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ৩ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৩৫ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫০৬ জন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩৯ জনকে অন্যত্র রেফার করা হয়েছে।বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত ডেঙ্গু রোগীর প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ১৭৩ জনের মধ্যে খুলনা জেলায় ৫১ জন এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪২ জন রয়েছেন। এছাড়া বাগেরহাটে ৩৮, যশোরে ১৯, মাগুরায় ৬, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫, কুষ্টিয়ায় ৩, মেহেরপুরে ৩, নড়াইলে ২, সাতক্ষীরায় ২, ঝিনাইদহে ১ এবং চুয়াডাঙ্গায় ১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
খুমেক হাসপাতালের আরএমও ডা: আরিফ মোহাম্মদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় মারুফা আক্তার (৩০) নামে এক নারী ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সোনাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা ফারুক ভূঁইয়া কর্মকারের মেয়ে মারুফা বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত ১২টার পর হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর ওই রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগের দিন ১৮ আগস্ট ওমর ফারুক (৬) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। দাকোপ উপজেলার বাসিন্দা ইদ্রিস সানার ছেলে ওমর ফারুক ওইদিন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।খুমেক হাসপাতালের আরএমও জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত এ হাসপাতালে ৯০২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৭১ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং বর্তমানে ১২৮ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের।
পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নগরীর বয়রা ডায়াবেটিক হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এ উদ্যোগের বিষয়টি আলোচনা হয়।
এদিকে খুমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও এনএস স্যালাইনের সংকট নেই বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ভর্তি ও বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষার জন্য সরকার নির্ধারিত ১০০ টাকা ফি নেওয়া হচ্ছে।
খুমেক হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের ল্যাব ইনচার্জ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো: মেফতাহুল ইসলাম জানান, বুধবার (১৯ আগস্ট) হাসপাতালে ৬২ জনের এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২৮ জনের ফল পজিটিভ আসে। একই দিনে ৬০ জনের আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা করা হলে দুজনের ফল পজিটিভ পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতিদিন ডেঙ্গু পরীক্ষায় ১৮ থেকে ২৫ জনের পজিটিভ ফল পাওয়া যাচ্ছে।
খুলনা সিভিল সার্জন মোসা. মাহফুজা খাতুন বলেন, খুলনার নয় উপজেলার মধ্যে রূপসায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভালো নয়। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইনের মজুতও কমে এসেছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত খুলনা জেলায় ১ হাজার ১৯২ জন, খুমেক হাসপাতালে ৯০২ জন এবং বাগেরহাটে ৯৫১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া যশোরে ৩৯০, নড়াইলে ১৫৯, মাগুরায় ৯৯, কুষ্টিয়ায় ৯৪, মেহেরপুরে ৭৩, ঝিনাইদহে ৫৮, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫১, সাতক্ষীরায় ১৯ এবং চুয়াডাঙ্গায় ৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
নগরীর চার ওয়ার্ড রেড জোন :
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মীউল ইসলামের স্বাক্ষরিত ১৫ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে ৮২৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আরও ২৪২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে দুজনের।
প্রতিবেদনে নগরীর ২২, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ১৭, ১৮, ২০ ও ২৮ নম্বর ওয়ার্ড অরেঞ্জ জোন এবং ১৬, ২০, ২৫ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড ইয়েলো জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে কেসিসি। তবে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর ঘটনা বাড়তে থাকায় খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।



