এখনও দুর্বল বেড়িবাঁধ নিয়ে শঙ্কিত কয়রা উপজেলাবাসী

অবহেলিত একটি জনপদের নাম কয়রা-(১)
# ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাসে বিপর্যস্ত, সুপেয় পানি বিহীন, লবণাক্ততায় ফসলহীন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ কয়রা #
রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) ঃ প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই খুলনার কয়রা উপজেলায় বেড়িবাঁধে ভাঙন ধরে। প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। এ বছরও বর্ষার শুরুতে কয়েকটি স্থানের বাঁধে ভাঙন ধরেছে। কোবাদক স্টেশনের পাশ্বে এবং মঠবাড়ি এলাকায় নদীর বাঁধ ভয়বহ ভাঙনের কবলে পড়েছে। এ ছাড়া ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও কয়েক কিলোমিটার বাঁধ। ফলে আতঙ্কে রয়েছে উপজেলার প্রায় ২ লাখ মানুষ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পরিকল্পিত আর স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় প্রতিবছরই ভাঙনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কে যথাযথ কার্যক্ররি ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রাা। তবে পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, এ ক্ষেত্রে তাদের করার কিছু থাকে না। কারণ ভাঙন না হলে তাৎক্ষণিক বরাদ্দ পাওয়া যায় না। জানা গেছে, কয়রায় পাউবোর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ রয়েছে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানার পর গত কয়েক বছরে আবারও ভাঙনের কবলে পড়েছে বেড়িবাঁধ। ষাটের দশকে নির্মিত এসব বেড়িবাঁধে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়নি। আইলার আঘাতে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ তিন বছর পর মেরামত করা সম্ভব হলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এলাকাবাসী ও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, কয়রার ঝুঁকিতে রয়েছে উপজেলার কয়েক কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাঁধ ১৩/১৪-১ ও ১৩/১৪-২ নম্বর পোল্ডারের অধীন। গত জুলাই মাসে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের গোলখালীর কোবাদক স্টেশনের পাশ্ববর্তী এলাকার বেড়িবাঁধ ব্যাপক ঝুঁকিতে পড়ে। পরবর্তীতে ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করায় কিছুটা রক্ষা পাওয়া গেলেও স্থায়ীত্ব বাঁধ নির্মান না করা হলেও আবারও ঝুঁকিতে থাকবে ঐ এলাকা। উত্তর বেদকাশি ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদ ও শাকবাড়িয়া নদীর কিছু অংশে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে ঢেউ আছড়ে পড়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত বাঁধ মেরামত করা না হলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা এলাকাবাসীর। ইতিমধ্যে মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ি গ্রামের শাকবাড়িয়া নদীর বাঁধ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ গ্রামের ভবসিন্ধু মন্ডল বলেন, ‘যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। এর আগেও কয়েকবার বাঁধ ভেঙে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ ভেঙে এলাকায় লোনা পানি ঢুকলে সব গাছ মরে যায়। মাটির ঘর ভেঙে পড়ে। তখন গরু-ছাগলসহ পশু-পাখি নিয়ে বিপদে পড়তে হয়। বাঁধ ঠিক হলে আবার ঘর ঠিক করে বসবাস শুরু করি। একটু গুছিয়ে উঠতেই দেখা যায় আবার বাঁধ ভেঙে সব শেষ হয়ে গেছে।’ ঐ এলাকার হায়াতখালী বেড়িবাঁধ রয়েছে ঝুঁকিতে। মহারাজপুর ইউনিয়নের লোকা গ্রামের মনিরুল ইসলাম বলেন, কপোতাক্ষ নদের লোকা এলাকায় বেড়িবাঁধে সংস্কার কাজ চলছে। অন্যদিকে ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বাঁধ।
ভাঙনে এলাকার অধিকাংশ জমি নদীতে চলে গেছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের দাবি, কিছু বাঁধের কোল ঘেঁষে চিংড়িঘেরের কারণেই ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। বাঁধ কেটে পাইপ ঢুকিয়ে পানি ওঠানো-নামানোর কারণে বেড়িবাঁধের এ অবস্থা বলে জানান তারা। কয়রা সদর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, তার এলাকার শাকবাড়িয়া নদীর গড়িয়াবাড়ী লঞ্চঘাট সংলগ্ন বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা না হলে নদী গর্ভে বিলিন হবে ঐ এলাকার বাঁধ। এ ছাড়া দুর্গামন্দিরের পাশেও ভাঙনরোধে কাজ করা দরকার। কয়রা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এ্যাডঃ আঃ রশিদ বলেন, অনেক এলাকার বেড়িবাঁধ নিচু হয়ে যাওয়ায় জলোচ্ছ্বাসে নদীর পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করে থাকে। দির্ঘদিন এ সকল বাঁধে মাটি না দেওয়ায় এমন দন্যদশার মধ্যে রয়েছে। কয়রার দশহালিয়া, গীলাবাড়ি, ৪নং কয়রা, মঠবাড়ি, কাটকাটা, সরদারঘাট, তেতুলতলার বাঁধগুলো রয়েছে ঝুঁকিতে। পাউবোর কয়রার আমাদী শাখার সেকশন অফিসার মোঃ মশিউল আবেদীন বলেন, পুরো কয়রা উপজেলা কয়েকটি বড় নদী দিয়ে বেষ্টিত। নদীর এই বাঁধের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে অনেক অংশের বাঁধে কাজ করা হয়েছে। সে সকল এলাকা ঝুঁকিমুক্ত। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য স্থান সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাউবোর সাতক্ষীরা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ বলেন, কয়রা অঞ্চলের ঝুঁকিপুর্ন বেড়িবাঁধ সংস্কারে কাজ করা হয়েছে। কিছু জায়গার এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে। সে সকল বাঁধ সংস্কারের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। এবং কাজ চলমান রয়েছে। এরপরেও জরুরী হলে ঠিকাদারদের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কাজ করা হবে।



