আতঙ্কে খুলনাবাসী : একের পর এক খুন করছে কারা?

# র্যাব অভিযান চালালেই ২৪ ঘন্টায় আসামী গ্রেফতার হয় কিন্ত পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ #
# চলতি মাসেই ৬ জন খুন #
স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনা নগরী ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক হত্যাকা- ও গুলির ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। চলতি আগস্টের প্রথম ২০ দিনেই নগরী ও আশপাশের এলাকায় ছয় জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকটি হত্যাকা- ঘটেছে প্রকাশ্যে এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে। তার মধ্যে বেশিরভাগ হত্যাকা- ঘটেছে গুলিতে। এসব ঘটনায় নগরী ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ বলছে, এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হলেও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ হত্যাকা-ের নেপথ্যে মাদক ব্যবসা এবং সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসছে। পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীতে হত্যাকা- বা গুলির ঘটনা ঘটিয়ে সন্ত্রাসীরা দ্রুত পার্শ্ববর্তী জেলায় পালিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে বেগ পেতে হচ্ছে। কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি কারণ হলো গ্রেফতারের পর অল্প সময়ের মধ্যে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়াতেও কঠোরতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
একের পর এক খুন ঃ সবশেষ ২০ আগস্ট শহরঘেঁষা বটিয়াঘাটা উপজেলার বটিয়াঘাটা বাজারসংলগ্ন নদী থেকে অজ্ঞাত এক তরুণীর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিন দুপুর পৌনে ১টার দিকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১৯ আগস্ট খুলনা নগরের লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে দু’ যুবক নিহত হন। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) নামের এক যুবককে গুলি ও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই এলাকায় নাজমুল (১৮) নামের আরেক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে তাকে কখন গুলি করা হয়, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহত মঞ্জুরুল ইসলাম আশিবিঘা এলাকার খোকন সানার ছেলে। তিনি বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। নাজমুল একই এলাকার মনির শেখের ছেলে। ঘটনায় ২১ আগস্ট র্যাব ৬ এর সদস্যরা গোপালগঞ্জের মাঝিরগাতি এলাকা থেকে সাইফি, রাকিব ও রাব্বীকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে। র্যাবকে দেওয়া সাইফির ভাষ্য অনুযায়ী মঞ্জু গ্রুপের সদস্যরা সাইফির দলের সদস্য নাজমুলকে ভিডিও কলে রেখে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করার ঘটনায় তারা ক্ষুদ্ধ হয়ে প্রতিশোধ নিতে ১৫-১৬জন সশস্ত্র অবস্থায় আশিবিঘা এলাকায় যায় এবং মঞ্জুকে তার বাবার সামনে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এর আগে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আশিবিঘা এলাকার একটি ফাঁকা মাঠে নিয়মিত ফুটবল খেলা হয়। বুধবার বিকালে সেখানে ফুটবল খেলা নিয়ে মঞ্জুরুলের সঙ্গে কয়েকজনের কথা কাটাকাটি হয়। খেলা শেষে মঞ্জুরুল তার এক বন্ধুকে নিয়ে আশিবিঘা কালভার্টের পাশে বসেছিলেন। এ সময় কয়েকজন সেখানে গেলে তাদের সঙ্গে মঞ্জুরুলের আবারও কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দুর্বৃত্তরা মঞ্জুরুলকে গুলি করে এবং ছুরি দিয়ে আঘাত করে। গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, লবণচরার আশিবিঘায় জোড়া হত্যাকা-ের ঘটনায় এ ২৩ আগস্ট রাতে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া এলাকা থেকে মোঃ ফারুক ও মাসুদুল ইসলাম কদরকে গ্রেপ্তার করে র্যাব ৬। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ৫জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ১৮ আগস্ট খুলনা মহানগরীর আড়ংঘাটা থানার রায়েরমহল এলাকায় রাজু শিকদার নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই দিন রাত ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে রূপসা উপজেলার নৈহাটি গ্রামের প্রতিবন্ধী স্কুলের সামনে মামুন মীর (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। বাগমারা গ্রামের মৃত নিয়ামত আলী মীরের বড় ছেলে মামুনকে আহত অবস্থায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মামুনের শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তবে তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। চিকিৎসকেরা তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনিমহল-শহীদের মোড় এলাকায় জয় ঢালি (২৫) নামের এক যুবককে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ১১ আগস্ট রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের কিসমত খুলনা গ্রামের একটি ইটভাটায় ফখরুল শেখ নামের এক যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ২৩ আগস্ট খুলনার দৌলতপুর মহেশ্বরপাশা ঘ্ষোপাড়ায় নিখোজ হয় শেখ মনিরুল ইসলাম রনি (২০)। দু’দিন পর তার লাশ বিল ডাকাতিয়ায় পাওয়া যায়। নিহতের মা নাছিমা বলেন, সন্ত্রাসীরা তার ছেলে ফুসলিয়ে বিল ডাকাতিয়া নিয়ে হত্যা করেছে।
খুলনায় এখন আতঙ্ক বিরাজ করছেঃ খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাড. বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘খুলনা শহরে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। অবিলম্বে খুলনাকে সন্ত্রাস কবলিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের তালিকা করে গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা গেলে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।’ বেড়েছে হত্যাকা- ঃ খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহানগরীতে ৪২টি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব হত্যাকা-ের ঘটনায় অন্তত দেড়শ’ আসামিকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। এরমধ্যে ১৪টি মামলার আসামিরা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এর আগের বছর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত মহানগরীতে হত্যা মামলা হয়েছিল ১৯টি। ফলে হত্যাকা-ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর জানা যাবে ঃ লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘একই এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’ যুবক গুলিতে নিহত হয়েছেন। ঘটনায় জড়িতদের মধ্য থেকে এ পর্যন্ত মোট ৫জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যেক হত্যাকা-ের ঘটনা তদন্ত চলছে। ইতিমধ্যে ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সব ঘটনায় দুই-চার জন করে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত করে অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে লবণচরায় জোড়া হত্যাকা-ের ঘটনায় ৫জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।’



