স্থানীয় সংবাদ

পাতাখালী গ্রামে এখনও গড়ে উঠেনি কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় : শিক্ষায় বঞ্চিত শিশুরা

অবহেলিত একটি জনপদের নাম কয়রা- (৪)

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) ঃ খুলনার কয়রা উপজেলার সর্ব দক্ষিণের জনপদ দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের পাতাখালী গ্রামে প্রায় চার হাজার মানুষের বসবাস। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও সেখানে গড়ে উঠেনি কোন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে শত শত শিশুকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পাশের গ্রামের বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। দীর্ঘ পথ, যাতায়াতের ব্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্েযর কারণে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথেই ঝড়ে যাচ্ছে। সুত্রে জানা গেছে, সরকারের প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার নানা উদ্যোগ, নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ এবং ঝরে পড়া রোধে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও সুন্দরবন সংলগ্ন এই গ্রামের বাসিন্দারা সেই সুবিধার বাইরে রয়ে গেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ তিন দশক ধরে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেও তারা কেবল আশ্বাসই পেয়েছেন। বাস্তবে কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয়রা জানায়, ১৯৯৬ সালে গ্রামের শিক্ষানুরাগীরা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ৩৩ শতক জমি দান করেন। পরে ২০০১ সালে সেখানে একটি কমিউনিটি স্কুল ভবন নির্মিত হলেও প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়টি আর চালু হয়নি। বর্তমানে ভবনটি পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে নেই কোনো শিক্ষক, নেই পাঠদান, নেই সরকারি তদারকি। ফলে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই বিচ্ছিন্ন গ্রামটির শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ আজও সীমিত। ঐ গ্রামের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পথ পাহড়ি দিয়ে পাশের গ্রামের স্কুলে যেতে হয়। সেখানকার দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে অনেক শিশুর নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা। ঐ গ্রামের শত শত শিক্ষার্থীরা দূরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও নদী-খাল পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। পাতাখালী গ্রামের শিক্ষার্থী রাবেয়া খাতুন আঃ রব, আমেনা খাতুন সহ আরও অনেকেই বলেন, প্রতিদিন অনেক দূরে হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্লান্তিও বেড়ে যায়। তাদের অনেক বন্ধু কষ্ট সহ্য করতে না পেরে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। তারা নিজেদের গ্রামেই একটি সরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। বিদ্যালয়ের জন্য জমিদাতা হায়দার মল্লিক বলেন, গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তারা ৩৩ শতক জমি দান করেছিলেন। কিন্তু ৩০ বছর পার হলেও বিদ্যালয় চালু হয়নি। বিভিন্ন দপ্তরে বারবার যোগাযোগ করেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। তার জীবদ্দশায় গ্রামের শিশুদের জন্য একটি বিদ্যালয় দেখে যেতে পারলে ভাল লাগতো বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্থানীয় ইউপি সদস্য গোলাম কিবরিয়া বলেন, বিদ্যালয় দূরে হওয়ার কারনে, পথের কষ্ট এবং পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিশু পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। এতে শিশুদের শ্রমে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বাল্য বিবাহের ঝুঁকিও বাড়ছে। গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এ জন্য তিনি বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তপন কুমার কর্মকার বলেন, পাতাখালী গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে। আগে সেখানে একটি কমিউনিটি স্কুল ছিল। তবে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়টি আর চালু হয়নি। তিনি আরও বলেন, অতীতে সেখানে নতুন বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেটি অনুমোদন পাইনি। এখন নতুন করে আর একটি প্রস্তাব পাঠানো হবে। খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম বলেন, পাতাখালী গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই এ বিষয়টি আমার জানা নেই। প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button