জেলায় জেলায় হবে ‘শিশুস্বর্গ’ : চাই সেবার মান

প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সব ধরনের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। গতকাল দেশে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এসেছে, এমন শিশুদের জন্য প্রতিটি জেলায় পর্যায়ক্রমে ‘শিশুস্বর্গ’ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে একই ছাতার নিচে চিকিৎসা, শিক্ষা, থেরাপি, পুনর্বাসন, আবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানেরও প্রস্তুতিমূলক সেবা পাওয়া যাবে। আমাদের দেশের বাস্তবতা বড়ই করুণ। একটি শিশুর প্রতিবন্ধিতা শনাক্ত হওয়ার পর পরিবারের দুঃখ-দুর্দশার সীমা থাকে না। সন্তানের চিকিৎসার জন্য একজন অভিভাবককে কত কত জায়গায় দৌড়াতে হয়। তার পরও কাক্সিক্ষত সেবা মেলে না। এতে অনেক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর সম্ভাবনা অঙ্কুরেই থেমে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন বাস্তবতা বদলে দিতে পারে এই ‘শিশুস্বর্গ’। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, দেশের ২.৮ শতাংশ মানুষের অন্তত একটি প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ১.৭ শতাংশ। আর কার্যকর সক্ষমতার সমস্যাকে বিবেচনায় নিলে দেশের ৭.১৪ শতাংশ মানুষের অন্তত একটি ফাংশনাল ডিফিকাল্টি রয়েছে। ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের তথ্য বলছে, দুই থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫ শতাংশের অন্তত একটি ক্ষেত্রে কার্যকর সক্ষমতার সমস্যা রয়েছে। পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে হাঁটাচলা, বিষণœতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যা তুলনামূলক বেশি। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষাবঞ্চনাও। ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী শিশুদের মাত্র ২৪.৩৬ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের একটি বড় অংশই সেবাবঞ্চিত অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। খবরে বলা হয়েছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের ২২টি জেলার ২২টি উপজেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের সার্বিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার কড়াইল বস্তিতে প্রতিবন্ধী শিশু শনাক্তকরণ ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে। এ ছাড়া গণপরিবহন, সরকারি সেবা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এসব উদ্যোগ শুধু চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে না, শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখবে। এর মধ্যে দুটি খবরে আমাদের চোখ আটকে গেছে। দুটি খবরই দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার করুণ চিত্র আমাদের সামনে এনেছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কো-া হাসপাতালের কথা বলা হয়েছে, যেখানে কোনো ধরনের সেবা পাওয়া যায় না, অথচ বছর বছর বরাদ্দ আসছে। প্রায় ২০ বছর আগে ২০ শয্যার হাসপাতালটি স্থাপন করা হলেও এখন বলা যায়, এটি পরিত্যক্তÑঅথচ নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও কর্মচারী আছেন, তাঁরা বেতনও পাচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেবা পাচ্ছে না। আরেকটি খবর হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়েÑসেখানে ভবন জরাজীর্ণ, আবার চিকিৎসকও নেই। খোঁজ নিলে দেশের আরো হাসপাতালে এমন চিত্র পাওয়া যাবে। দেখা যাচ্ছে, সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ঠিকই বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে, অর্থও বরাদ্দ হচ্ছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সুষ্ঠু বাস্তবায়নের অভাবে সাধারণ মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করছি, ‘শিশুস্বর্গ’ সেবার মান নিশ্চিত করবে এবং সত্যিকার অর্থেই শিশুদের সুস্থ বিকাশের আনন্দময় ঠিকানা হয়ে উঠবে।
