খুলনায় বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত

# চাহিদার চেয়ে সরবরাহ ১১৬ মেগাওয়াট কম #
# ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত #
# মূলতঃ ৪টি কারণে এত বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেশে #
কামরুল হোসেন মনি ঃ
তীব্র গরমের মধ্যে খুলনায় বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নগরবাসী। দীর্ঘ সময় পর বিদ্যুৎ এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার চলে যাচ্ছে। এতে বাসাবাড়ির পাশাপাশি মিল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থী ও অনলাইনভিত্তিক পেশাজীবীদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কমে বাড়ছে লোকসানের আশঙ্কা। ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, এ পরিস্থিতি শুধু জনদুর্ভোগ নয়, অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের কারণ।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: রাকিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার (৩০ আগস্ট) সকাল ১০টায় খুলনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫২২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৪০৬ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১১৬ মেগাওয়াট। একই সময়ে বরিশাল জোনে ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২৫ মেগাওয়াট। দুই জোনে মোট ৬৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৫৩১ মেগাওয়াট। মোট ঘাটতি দাঁড়ায় ১৪৬ মেগাওয়াট।
ওজোপাডিকোর তথ্য বলছে, ওই সময়ে খুলনায় ৪২ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। এছাড়া বাগেরহাটে ৪, নড়াইলে ২, মাগুরায় ৮, কুষ্টিয়ায় ১০, ঝিনাইদহে ১৩, চুয়াডাঙ্গায় ১, ফরিদপুরে ৮, রাজবাড়ীতে ১৪, মাদারীপুরে ৬, শরীয়তপুরে ২ এবং গোপালগঞ্জে ৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। বরিশাল বিভাগের বরিশালে ১৯, ঝালকাঠিতে ৩, পিরোজপুরে ৩, বরগুনায় ২ এবং ভোলায় ৩ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
এক রাতে ৯ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঃ
নগরীর লবণচরা এলাকার বাসিন্দা মো. শাহরিয়ার রাব্বি বলেন, শনিবার বিকেল থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত অন্তত নয়বার বিদ্যুৎ চলে গেছে। প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ এলেও সর্বোচ্চ ২০ মিনিট পর আবার চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, তিনি ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। অনলাইনে কাজ করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো ক্লায়েন্টদের কাজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে কাজের ক্ষতির পাশাপাশি ক্লায়েন্ট হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। নগরবাসী জানান, রাতে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকায় পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে অনলাইন ক্লাস, অফিসের কাজ ও ইন্টারনেটনির্ভর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে শিল্প খাত। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় মিল-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি মিল-কারখানার উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে এক ধরনের ‘ইকোনমিক টর্চার’ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, সারা বিশ্ব সৌরবিদ্যুতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত বিকল্প বিদ্যুতের দিকে যেতে হবে। যারা সৌরবিদ্যুৎ আমদানি করবে, তাদের প্রণোদনা দিয়ে এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে নতুন করে নির্মাণ করা ছয়তলার বেশি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন কুদরত-ই-খুদা। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার দাবি, একটি ইজিবাইক চার্জ দিতে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। খুলনায় কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুরও দাবি জানান তিনি। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের কারণে নগরীতে গণপরিবহন ব্যবস্থা কাক্সিক্ষতভাবে গড়ে ওঠেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগের সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
কেন এত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে ঃ (১) গ্যাসের তীব্র সংকট ঃ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। কিন্তু এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
(২) কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত ঃ বড়পুকুরিয়াসহ দেশের বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কিছু ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি ও কয়লা সরবরাহে সমস্যার কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া আদানি পাওয়ার কেন্দ্র থেকেও পুরো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
(৩) বিদ্যুতের চড়া চাহিদা: গরম ও আবহাওয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি মধ্যরাতে বা অন্যান্য সময়ে অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কারণেও বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।
(৪) অর্থনৈতিক ও বকেয়া জটিলতা: বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্র ও আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া বিল জমে যাওয়ার কারণেও জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।


