আত্মসমর্পণের পরও ফের অপরাধে ৩০ জলদস্যু

নতুন আত্মসমর্পণকারীদের ৮ জনও সেই তালিকায়
স্টাফ রিপোর্টার : সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে একের পর এক আত্মসমর্পণ করানো হলেও পুরোপুরি থামেনি অপরাধে ফেরার প্রবণতা। ইতিপূর্বে আত্মসমর্পণের পর পুণর্বাসনের পরও এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন আবার অপরাধমূলক জীবনে ফিরে গেছে। এবার নতুন করে আত্মসমর্পণ করা ৫৯ জনের মধ্যেও আটজন রয়েছে, যারা এর আগে আত্মসমর্পণ করে আবার অপরাধে ফিরেছিল।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় র্যাব-৬ কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান র্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ। এর আগে মঙ্গলবার সুন্দরবনে পাঁচটি জলদস্যু বাহিনীর ৫৯ সদস্যের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবেও তিনি এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, এ পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩১৮ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন আবার অপরাধমূলক কর্মকা-ে ফিরে গেছে। আত্মসমর্পণ কারীদের একটি অংশ পুনর্বাসনের সুযোগ পাওয়ার পরও কেন আবার অপরাধে ফিরছে, সেটিই এখন নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তিনি বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন।
তার ভাষ্য, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক কারণ, সচেতনতার অভাব, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনীহা এবং হয়রানির ভয়—এসব কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে ৩১৮ জনের মধ্যে ৩০ জনের ফিরে যাওয়ার হারকে খুব বেশি মনে করছেন না র্যাব মহাপরিচালক।
তিনি বলেন, ‘আমরা ১০০ শতাংশ তো আর আনতে পারব না। যেহেতু আমরা তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে পারি না। আর কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতাও থাকে।’ আত্মসমর্পণকারীদের বিষয়ে নজরদারি নেই—এমনটি নয় বলেও জানান তিনি। র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। আত্মসমর্পণের পর কেউ আবার অপরাধে জড়াচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
র্যাব মহাপরিচালক জানান, সুন্দরবনে এখনো চার থেকে পাঁচটি জলদস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর সদস্যদেরও অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। আত্মসমর্পণকারীদের জন্য নেওয়া পুনর্বাসন প্যাকেজ দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হবে বলে আশা করছেন তিনি। তবে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আগের চেয়ে ভালো পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে আত্মসমর্পণকারীদের অহেতুক মামলা ও হয়রানির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
র্যাব মহাপরিচালক আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক কিংবা মামলা দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে। সুন্দরবনের নিরাপত্তা জোরদারে সেখানে একটি র্যাব ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় কোস্ট গার্ডের একটি ক্যাম্প রয়েছে। সুন্দরবনবাসী চাইলে সেখানে র্যাবের একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারেন বলে জানান তিনি।
এ সময় দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরুর কথাও জানান র্যাব মহাপরিচালক। র্যাবের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করবে। এর কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে বলে জানান তিনি।
অভিযানে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার জন্য গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে।
এদিকে বনপ্রাণীর প্রজনন, বিচরণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে বিধিবিধান ও অনুমতি সাপেক্ষে সুন্দরবন আবার পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক। একই সঙ্গে উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন-জীবিকা এবং দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, এবার আত্মসমর্পণ করা ৫৯ জনের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনরুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতার বাহিনীর আটজন এবং মিজান বাহিনীর সাতজন রয়েছেন।
তাদের আত্মসমর্পণের সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও উদ্ধার করেছে র্যাব। উদ্ধার করা হয়েছে ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ ও সাতটি ওয়াকিটকি।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চারটি শটগান, ৪৭টি ওয়ান শুটার গান, চারটি পাইপগান, তিনটি এয়ারগান এবং একটি পয়েন্ট ২২ বোর রাইফেল।
র্যাব বলছে, সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে র্যাব, কোস্ট গার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান চলছে। গত ২ মার্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে এ অভিযান পরিচালনা করছে র্যাব ফোর্সেস।



