সাতক্ষীরায় মাদকসেবীদের ডোপ টেস্টের পর সামারি ট্রায়ালের নির্দেশ আইনমন্ত্রীর

# ২৩ নতুন আদালতে দ্রুত বিচারক-স্টাফ নিয়োগের আশ্বাস
# ৭৬ হাজার ২৮৭ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ
বদিউজ্জামান, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ঃ সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরাকে মাদকমুক্ত করতে মাদকসেবীদের ডোপ টেস্টের পর সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান, এমপি। তিনি বলেছেন, মাদক নির্মূলে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালান বন্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে বিচার বিভাগ, সাতক্ষীরার আয়োজনে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সাতক্ষীরার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, সীমান্ত জেলা হিসেবে সাতক্ষীরাকে মাদকমুক্ত করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া যাবে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ডোপ টেস্টের পর সামারি ট্রায়াল করতে হবে এবং মাদক নির্মূলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়াতে হবে। বিচারকদের কর্মঘণ্টাকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সাতক্ষীরায় বর্তমানে ৭৬ হাজার ২৮৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একজন বিচারককে আরেকজন বিচারকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়াতে হবে।
সাতক্ষীরায় নতুন ২৩ আদালত, দ্রুত বিচারক-স্টাফ নিয়োগ ঃ সাতক্ষীরার বিচার বিভাগের জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি জেলায় অতিরিক্ত দায়রা জজের ৬টি, যুগ্ম দায়রা জজের ৮টি, সিনিয়র সিভিল জজের ২টি, সিভিল জজের ৫টি এবং পারিবারিক আদালতের ২টিসহ মোট ২৩টি নতুন আদালত সৃজন করা হয়েছে।
অতি দ্রুত এসব আদালতে বিচারক ও সহায়ক স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে বিচারপ্রার্থী মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও সহজ হবে।
বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে। সাতক্ষীরায় বিচারক, জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
লিগ্যাল এইডে জনবল বাড়ানোর আশ্বাস ঃ
লিগ্যাল এইডকে আরও জনবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করে মামলা জট কমাতে হবে। প্রয়োজনে লিগ্যাল এইড অফিসে জনবল বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হবে।
দেশ একটি ক্রান্তিকাল পার করছে উল্লেখ করে তিনি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের চোখ-কান খোলা রেখে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেন।
সাতক্ষীরা বিচার বিভাগকে ‘মডেল’ বললেন আইনমন্ত্রী ঃ আদালত প্রাঙ্গণের পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী সাতক্ষীরা বিচার বিভাগকে দেশের অন্যান্য জেলা আদালতের তুলনায় মডেল হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সাতক্ষীরা বিচার বিভাগের সামাজিক বনায়ন, দৃষ্টিনন্দন ‘শাপলা চত্বর’, বিচারপ্রার্থীদের বসার জন্য ‘ছায়াবিথী’ এবং ‘ন্যায়কুঞ্জ’সহ আদালত প্রাঙ্গণের সামগ্রিক পরিবেশের প্রশংসা করেন।
বিচারক সংকটের চিত্র তুলে ধরলেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ঃ সভাপতির বক্তব্যে সাতক্ষীরার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম জেলার বিচার বিভাগের বিভিন্ন সমস্যা ও সংকট তুলে ধরেন।
তিনি জানান, সাতক্ষীরায় বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ জন, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পদে ২ জন, সিনিয়র সিভিল জজ পদে ২ জন, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদে ১ জন এবং জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদে ৫ জনসহ মোট ১১ জন বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে।
এসব পদে অবিলম্বে বিচারক নিয়োগের জন্য আইনমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান তিনি।
১৪ বিচারক ও ৭২ স্টাফ নিয়োগের দাবি ঃ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ বলেন, সাতক্ষীরায় নতুন করে ২৩টি আদালত সৃজন করা হলেও এসব আদালতের জন্য বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীর পদ সৃষ্টি করা হয়নি। অতি দ্রুত দায়রা আদালতসমূহে ১৪ জন বিচারক ও ৭২ জন স্টাফ নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, সাতক্ষীরায় একটি বাণিজ্যিক আদালত সৃজন করা হলেও সেখানে বিচারক ও স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বিচারকের পদ থাকলেও সহায়ক স্টাফের পদ নেই।
২০২৫ সালে ১২,২৮৭ মামলা নিষ্পত্তি ঃ সভায় জানানো হয়, ২০২৫ সালে সাতক্ষীরায় মোট ১২ হাজার ২৮৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে দেওয়ানি মামলা ৪ হাজার ২২৭টি, ফৌজদারি মামলা ৪ হাজার ৬৩৭টি, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মামলা ২ হাজার ৬১৭টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ৮০৬টি মামলা রয়েছে।
৮ মাসে লিগ্যাল এইডে ২,১৭৭ আবেদন, প্রায় দেড় কোটি টাকা আদায় ঃ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ জানান, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সাতক্ষীরা লিগ্যাল এইড অফিসে মোট ২ হাজার ১৭৭টি আবেদন জমা পড়েছে। এ সময়ে এডিআরের মাধ্যমে ১ হাজার ৪৬৪টি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ৪৫৫টি সফল মেডিয়েশন হয়েছে।
এ সময়ে ১ হাজার ৪৩২ জন নারী ও ৪২৬ জন পুরুষকে আইনি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আপস-মীমাংসার মাধ্যমে (এডিআর) ১ কোটি ৪৫ হাজার টাকা অর্থ আদায় করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, লিফট ও পরিবহন সুবিধার দাবি ঃ বিচারাঙ্গনের সুন্দর পরিবেশ বজায় রেখে নির্বিঘেœ বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বিদ্যুতের ডাবল ফেজ স্থাপনের দাবি জানান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ।
১০ তলা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের ওঠানামার জন্য দুটি লিফট স্থাপনের দাবি জানান তিনি। বিভিন্ন আদালত ও লিগ্যাল এইড অফিসে বিচারক এবং সহায়ক স্টাফের সংকট দূর করার পাশাপাশি আদালতকে উমেদারমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণের কথাও বলেন।
জারি কারকদের জন্য মোটরসাইকেল এবং টিএ-ডিএ’র ব্যবস্থা করার দাবিও তুলে ধরেন তিনি।
সবশেষে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ বলেন, বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীর সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে সাতক্ষীরায় দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মতবিনিময় সভায় বিচার বিভাগ, সাতক্ষীরার সকল পর্যায়ের বিচারকগণ উপস্থিত ছিলেন।



