খুমেক হাসপাতালে ২০ শয্যার ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার চালু হয়নি এখনও : ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েও প্রশ্নখুমেক হাসপাতালে ২০ শয্যার ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার চালু হয়নি এখনও : ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েও প্রশ্ন

শেখ মোঃ জাকির হোসেন, খুমেক প্রতিনিধি ঃ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের উন্নত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্মাণ করা হয়েছে ২০ শয্যার ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার (ওসেক)। প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল ও গ্যাস পাইপলাইনসহ আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো তৈরির কাজও শেষ হয়েছে। কক্ষ তৈরি হয়েছে, বসানো হয়েছে সেন্ট্রাল এসি, দেয়ালে উঠছে রং। কিন্তু এতসব আয়োজনের পরও চালু হয়নি কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা। ফলে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো এখন কার্যত ব্যবহারহীন পড়ে আছে। সময়ের সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে নির্মিত কক্ষের বিভিন্ন সুবিধা ও স্থাপনা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় চালু করা যাচ্ছে না গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিট। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষ দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ বেডের ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুতে ওই দরপত্র ওপেন করা হয় এবং একই বছরের মার্চ থেকে নির্মাণকাজ শুরু হয়। কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড পেনডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতায় শুরু হওয়া এ প্রকল্পে সিভিল ও ইলেকট্রিক্যাল কাজের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৯১ লাখ ১৫ হাজার ১৬৬ টাকা। আর গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনে ব্যয় ধরা হয় ৬৮ লাখ ৯১ হাজার ৫০২ টাকা। অর্থাৎ দুটি কাজেই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৬০ লাখ ৬ হাজার ৬৬৮ টাকা। প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে থাকার কথা ছিল ৬ শয্যার হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ), ৪ শয্যার ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), ১০টি জেনারেল বেড এবং একটি মিনি অপারেশন থিয়েটার। অর্থাৎ জরুরি ও সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি সমন্বিত ইউনিট হিসেবে এটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার পরও চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় সেই উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। বরং ব্যবহারের অপেক্ষায় থাকা অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিন পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনেসথেসিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রধান দিলীপ কুমার কুন্ড জানান, ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারটি চালু করা গেলে হাসপাতালে ইনডোরে রোগী ভর্তির চাপ অনেকাংশে কমে আসত। পাশাপাশি সংকটাপন্ন রোগীরা দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতেন, ফলে মৃত্যুঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতো। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকায় ইউনিটটি এখনও চালু করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় সেখানে স্থাপিত সেন্ট্রাল এসি, কক্ষসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, দ্রুত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করে ইউনিটটি চালু করা হোক। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম রাজিব জানান, রুমগুলো তৈরির কাজ আমাদের। সেগুলো আমরা তৈরি করে দিয়েছি এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন মেডিকেল যন্ত্রাংশ ও জনবল সংকট এগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাজ। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই বক্তব্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে অবকাঠামো বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি করা হলেও, হাসপাতালের নিজস্ব নথিতে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। প্রতিবেদকের হাতে আসা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখের চিঠিতে দরপত্রে উল্লিখিত কাজের বিবরণের সঙ্গে বাস্তব কাজের অসামঞ্জস্য, বিভিন্ন ত্রুটি ও বিচ্যুতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে জানানো হয়, হাসপাতালের গঠিত কমিটি ২০ শয্যার ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার, ৫ শয্যার অবস আইসিইউ এবং ৫ শয্যার পেডিয়াট্রিকস আইসিইউ পরিদর্শন করে। পরিদর্শনকালে দরপত্রে উল্লিখিত কাজের বিবরণের সঙ্গে বাস্তব কাজের অসামঞ্জস্য এবং বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয় বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়। চিঠিটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. কাজী আইনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত। এর অনুলিপি মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; পরিচালক, হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ; পরিচালক (স্বাস্থ্য), খুলনা বিভাগ; উপ-পরিচালক, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কাছে পাঠানো হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে- গণপূর্ত অধিদপ্তর যদি নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে অবকাঠামো বুঝিয়ে দিয়েই থাকে, তাহলে হাসপাতালের গঠিত পরিদর্শন কমিটি কেন দরপত্রের কাজের সঙ্গে বাস্তব কাজের অসামঞ্জস্য ও বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি পেয়েছিল? এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি কী ছিল, সেগুলো আদৌ সংশোধন করা হয়েছে কি না এবং ত্রুটি থাকা অবস্থায় প্রকল্পের কাজ কীভাবে হস্তান্তর করা হলো এখন সেসব প্রশ্নেরও জবাব প্রয়োজন। একদিকে গণপূর্তের দাবি, তাদের নির্মাণকাজ শেষ এবং অবকাঠামো বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতালের লিখিত নথিতে ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখ। এই দুই বক্তব্যের মধ্যকার অসামঞ্জস্যই এখন প্রকল্পটির বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম জানান, একটি প্রকল্পের আওতায় ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ারের কাজটি শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সরাসরি কিছু করার সুযোগ নেই। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তবে ইউনিটটি চালু করা গেলে খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে আসত এবং তারা আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পেতেন। একদিকে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল ও গ্যাস পাইপলাইনের কাজ। অন্যদিকে আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য নির্ধারিত ২০ শয্যার ইউনিট। কক্ষ প্রস্তুত, সেন্ট্রাল এসি স্থাপন করা হয়েছে, দেয়ালে রং করা হচ্ছে। কিন্তু রোগীরা পাচ্ছেন না সেই কাক্সিক্ষত সেবা। এর মধ্যে হাসপাতালের নিজস্ব পরিদর্শন কমিটি আবার দরপত্রের কাজের সঙ্গে বাস্তব কাজের অসামঞ্জস্য ও বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ও উল্লেখ করেছে। তাহলে প্রকল্পের কাজ বাস্তবে কতটা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে? ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো কী এবং সেগুলো সংশোধনের অগ্রগতি কতটুকু? প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ কী? প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল কবে দেওয়া হবে? আর এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো কতদিন এভাবে পড়ে থাকবে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা একটি আধুনিক ইউনিট যদি চালুই না হয়, তাহলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি এই অবকাঠামোর সুফল কবে পাবেন রোগীরা? সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিশ্চিত করে ইউনিটটি চালু করা গেলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি ও সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসাসেবায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা হাসপাতালের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোরও দ্রুত সমাধান জরুরি।



