খুলনায় ৮ মাসে ২২ ‘ধর্ষণ’

নগরীর ৬ থানায় ২২টি ধর্ষণ ও ৪ থানায় ৮টি ধর্ষণ প্রচেষ্টা মামলা, গ্রেপ্তার ৩৫
নাগরিক নেতা ও আইনজ্ঞরা বলছেন- মাদকের ছড়াছড়ি, ইন্টারনেটে অশ্লীলতা ও পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব-ই এই সামাজিক অবক্ষয়ের প্রধান কারণ
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা মহানগরীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, খুন, ধর্ষণ ও ধর্ষণ প্রচেষ্টা, মাদক, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, জখমসহ বিভিন্ন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকা- অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব, নৈতিকতার অবক্ষয় ও মাদকের ছড়াছড়িসহ বিবিধ কারনে খুলনায় ধর্ষণ নামক সামাজিক ব্যাধি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব অপরাধমূলক কর্মকা- দমন ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)।
কেএমপির প্রাপ্ত তথ্য সূত্রনুসারে, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারী হতে আগষ্ট মাস পর্যন্ত মহানগরীর ৮টি থানায় মধ্যে ৬টি থানায় ধর্ষণের ঘটনায় মোট ২২টি মামলা দায়ের হয়। ওইসব মামলায় এজাহারনামীয় মোট আসামীর সংখ্যা ৩৬জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ২৪জন, বর্তমানে মামলা তদন্তনাধীন রয়েছে ১২ টি এবং তদন্ত শেষে আদালতে মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান করা হয়েছে ১০টির। যার মধ্যে খুলনা থানার মামলা সংখ্যা ৫টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ৯জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ৪জন, মামলা তদন্তনাধীন রয়েছে ১টি এবং তদন্ত শেষে আদালতে মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান ৪টি, সোনাডাঙ্গা থানার মামলা সংখ্যা ৮টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ১৪জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ১০জন, মামলা তদন্তনাধীন রয়েছে ৬টি এবং তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশীট (সিএস) প্রদান ২টি, লবণচরা থানার মামলা সংখ্যা ২টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ২জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ২জন, আদালতে মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান ২টি, খালিশপুর থানার মামলা সংখ্যা ৫টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ৮জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ৬জন, মামলা তদন্তনাধীন রয়েছে ৪টি এবং তদন্ত শেষে আদালতে মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান ১টি, দৌলতপুর থানার মামলা সংখ্যা ১টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ১জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ১জন, মামলা তদন্তনাধীন রয়েছে ১টি এবং আড়ংঘাটা থানার মামলা সংখ্যা ১টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ২জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ১জন, আদালতে এ মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারী হতে আগষ্ট মাস পর্যন্ত মহানগরীর ৮টি থানায় মধ্যে ৪টি থানায় ধর্ষণ প্রচেষ্টার ঘটনায় মোট ৮টি মামলা দায়ের করা হয়। ওইসব মামলায় এজাহারনামীয় মোট আসামীর সংখ্যা ১৪জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ১১জন, বর্তমানে মামলা তদন্তনাধীন রয়েছে ৪টি এবং তদন্ত শেষে আদালতে মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান ৪টি। যার মধ্যে সোনাডাঙ্গা থানার মামলা সংখ্যা ১টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ১জন, মামলাটি তদন্তনাধীন রয়েছে। লবণচরা থানার মামলা সংখ্যা ৩টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ৩জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ৩জন, মামলা তদন্তনাধীন রয়েছে ২ টি এবং তদন্ত শেষে আদালতে মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান ১টি। খালিশপুর থানার মামলা সংখ্যা ৩টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ৭জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ৭জন, মামলা তদন্তনাধীন রয়েছে ১টি এবং তদন্ত শেষে আদালতে মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান ২ টি এবং খানজাহান আলী থানার মামলা সংখ্যা ১টি, এজাহারনামীয় আসামীর সংখ্যা ৩জন, গ্রেপ্তারকৃত আসামীর সংখ্যা ১জন এবং তদন্ত শেষে আদালতে মামলার চার্জশীট (সিএস) প্রদান করা হয়েছে।
সাবেক কাউন্সিলর এস এম হুমায়ূন কবির জানান, মাদকের অবাধ ছড়াছড়ি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে অশ্লীল ভিডিও প্রদর্শনের সহজলভ্যতা, পারিবারিক, প্রতিষ্ঠানিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতিকেই আমি ধর্ষণ নামের ব্যাধির অন্যতম কারণ। প্রতিরোধে প্রশাসনকে চোঁখ-কান খোলা রেখে মাদকের অবাধ বিচরণ রোধে কঠোর ভূমিকা পালন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজলভ্য অশ্লীল বিষয়বস্তু বন্ধে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণসহ পারিবারিক, প্রতিষ্ঠানিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চা শুরু করলে এ অপরাধ হ্রাস পারে বলে আমি মনে করি।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক সুরাইয়া সিদ্দিকা জানান, সংঘাত বা ধর্ষণের শিকার নারীদের জন্য ‘কুইক রেসপন্স টিম’ আইনি পরামর্শ ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা। ভিকটিমের আইনি সাহায্য, চিকিৎসাসেবা ও ডাক্তারি রিপোর্টের দ্রুত প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগীদের সরাসরি ওসিসি (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) এ পাঠানো ও সহায়তা দেওয়া হয়। একই সাথে ভুক্তভোগী নারী ও শিশুদের সাময়িক আবাসন ‘মহিলা সহায়তা কেন্দ্র’-এ ৬ মাসের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এড. বাবুল হাওলাদার বলেন, সমাজে মানুষের নৈতিকতার অবক্ষয় ও সামাজিক বন্ধনের অভাব, মাদকদ্রব্যের ব্যাপক বিস্তার, ইন্টারনেটে অপসংস্কৃতি ও বিভিন্ন ক্ষতিকর সাইডের সহজলভ্যতা ধর্ষণের অন্যতম কারন। আইনের প্রয়োগে কিছু ফাঁক-ফোকর, এজাহার দায়ের, নথিপত্র প্রস্তুত এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারিত্বে ঘাটতি থাকায় অনেক সময় আসামিরা পার পেয়ে যায়। এ সামাজিক অবক্ষয়রোধে মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক পরর্বিতন, সামাজিক দায়িত্ব অর্থ্যাৎ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তত্বি এবং গণমাধ্যমকে সচতেনতামূলক ভূমিকা পালনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও গোয়ন্দো সংস্থাসমূহের দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নাগরিকদের সচেতন ও সংবদেনশীল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিৎ বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা জেলা সমন্বয়কারী এড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, মামলা দায়েরের পর থেকে প্রতিটি স্তরে সুষ্ঠু ও নিরপক্ষে তদন্ত হওয়া জরুরি। বিশেষ করে ডিএনএ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট মামলার ভবিষ্যৎ ও আসামরি শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এছাড়া মামলার বিচারিক কার্যক্রমে সাক্ষীদের প্রভাবান্বিত করার চেষ্টা একটি বড় বাঁধা। তবে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং নিরপেক্ষ তদন্তরে মাধ্যমে সাক্ষ্য-প্রমাণ সঠিক থাকলে আসামির পার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। বর্তমানে শিশু ও নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের ফলে ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত বিচার ও নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদরে ন্যায়বচিার নিশ্চিত করতে সাহায্য করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর খুলনা জেলা সভাপতি এড, কুদরত-ই খুদা বলেন, সামাজিক শাসনের অনুপস্থিতি, আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব অর্থ্যাৎ, সময়মতো অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও শাস্তির মুখোমুখি না করা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘ সূত্রিতা, মাদকাসক্তি সোশ্যাল মিডিয়া (ফসেবুক) ও অপসংস্কৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীল বিষয়বস্তুর অবাধ প্রচার ও প্রলোভন, অপরাধী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধি বা অবস্থায় বিস্তার লাভ করেছে। এ সামাজিক ব্যাধিরোধে আইনের সঠিক প্রয়োজ ও সঠিক চার্জশিট প্রদান, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিশ্চিত, সরকারি প্রচার ও সামাজিক সচেনতা বৃদ্ধি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গবষেণা অর্থ্যাৎ অপরাধীদরে মনস্তত্ত্ব বুঝে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর র্কাযকারী পদক্ষপে গ্রহণ করলে এ অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পাবে বলে আমি মনে করি।
লবণচরা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সৈয়দ মোশারেফ হোসেন বলেন, থানায় যোগদানের পর একটি ধর্ষণ প্রচেষ্টা মামলা রুজু হয়। ওই মামলার আসামী গ্রেপ্তারপূর্বক অত্যন্ত গুরুত্ব ও সচ্ছতার সাথে তদন্তের কার্যক্রম শেষ করে ইতোমধ্যে চার্জশিট আদালতে প্রেরণ করেছি। একই সাথে সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মাদকসহ সকল আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকা-ের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান অব্যহত আছে।
কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রামই এন্ড অপারেশনস্্, ভারপ্রাপ্ত) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, খুলনায় প্রতিটি অপরাধমূলক কর্মকা-ের ঘটনায় মামলা দায়েরের পাশাপাশি জড়িতদের শণাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে আমরা বদ্ধ পরিকর। ধর্ষণ মামলার এজাহার থেকে শুরু করে, আসামি গ্রেপ্তার, ভিকটিমের সুরক্ষাসহ তদন্তের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গুরুত্বের সাথে পরিচালনা করা হয়ে থাকে। ধর্ষণ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলেও জানান এ কর্মকর্তা। তিনি মহানগর এলাকায় যে কোনো আইন-শৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকা-ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহয়তা করার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানান।
এদিকে, সামাজিক এ ব্যাধি প্রতিরোধে নাগরিক নেতারা আইনের সঠিক প্রয়োগ, মামলার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্ত, সঠিক চার্জশিট প্রদান, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত, সরকারি প্রচার ও সামাজিক সচেনতা বৃদ্ধি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গবেষেণা অর্থ্যাৎ অপরাধীদরে মনস্তাত্বিক অবস্থা বুঝে পুলিশ ও গোয়ন্দো সংস্থাগুলোর র্কাযকরী পদক্ষপে গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।



