কিট সংকটে খুমেকে দুই বছর বন্ধ ‘ব্লাড সেল সেপারেটর’ মেশিন

# খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ #
কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাটিলেট সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। একদিনে খুলনা বিভাগে ৩৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে রক্তের উপাদান আলাদা করার ‘ব্লাড সেল সেপারেটর’ মেশিনটি প্রয়োজনীয় কিটের অভাবে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ। ফলে হাসপাতালে বিনামূল্যে প্লাটিলেটসহ রক্তের বিভিন্ন উপাদান পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। বাইরে থেকে একটি কিট কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৭ হাজার ৮০০ টাকা। আবার প্লাটিলেট সংগ্রহে চার ব্যাগ রক্তের ডোনার জোগাড় করতেও রোগীর স্বজনদের বাড়তি টাকা ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগে মোট ১০ হাজার ৭৬২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুলনায় ৯ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১ জন, বাগেরহাটে ৩ জন, যশোরে ২ জন এবং চুয়াডাঙ্গায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে পরিচালক ডা. শেখ মো: মোশাররফ হোসেন স্বাক্ষরিত ডেঙ্গু রোগীর প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় নতুন করে ৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৪৮ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৪৯ জন ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬৩ জন, বাগেরহাটে ৮৫ জন, সাতক্ষীরায় ১২ জন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮ জন, যশোরে ৩৩ জন, ঝিনাইদহে ২৮ জন, মাগুরায় ১৭ জন, নড়াইলে ১৫ জন, কুষ্টিয়ায় ১৩ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৩ জন এবং মেহেরপুরে ২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
কিট নেই, বন্ধ মেশিন :
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও প্লাটিলেট সরবরাহে স্বস্তি নেই। খুমেক হাসপাতালে রক্তের উপাদান আলাদা করার ‘ব্লাড সেল সেপারেটর’ মেশিন থাকলেও প্রয়োজনীয় কিট নেই প্রায় দুই বছর ধরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কিট সরবরাহ না থাকায় মেশিনটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
ফলে হাসপাতালে বিনামূল্যে যে সেবা পাওয়ার কথা, তা নিতে রোগীদের বাইরে ছুটতে হচ্ছে। সামর্থ্যবান রোগীরা বাইরে থেকে কিট কিনে সেবা নিতে পারলেও এতে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিটি কিট কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৭ হাজার ৮০০ টাকা।
চার ব্যাগ রক্তের ডোনার জোগাড়েও ভোগান্তি :
ডেঙ্গু আক্রান্ত মাহফুজুর রহমানের পরিবার এই সংকটেরই মুখোমুখি হয়েছে। তাঁর বাবা আল-আমিন বলেন, ছেলের শরীরে প্রয়োজনীয় প্লাটিলেটের অর্ধেকও নেই। দ্রুত প্লাটিলেট দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ‘এ পজিটিভ’ রক্তের চার ব্যাগ। তিনি বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছেলের জন্য একদিকে প্লাটিলেটের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে চারজন রক্তদাতা খুঁজে বের করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিবারের জন্য এটি আরেক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল-আমিন বলেন, “ছেলের চিকিৎসা নিয়ে এমনিতেই দুশ্চিন্তায় আছি। তার ওপর রক্তদাতা খুঁজতে হচ্ছে, বাইরে থেকে সেবা নিতে হচ্ছে। শুধু রক্তদাতা জোগাড় করতেই প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। খরচের কথা আর কী বলবÑছেলেকে বাঁচানোই এখন বড় কথা।”
শুধু ডেঙ্গু নয়, বিপাকে অন্য রোগীরাও :
শুধু ডেঙ্গু রোগী নয়, রক্তের নির্দিষ্ট উপাদান প্রয়োজন এমন রোগীরাও পড়েছেন বিপাকে। খুলনায় বিটা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত নুরুল আমিনকে মাসে দুই থেকে চারবার রক্ত দিতে হয়। তাঁর ক্ষেত্রে শুধু রেড সেল বা প্যাকড সেল প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা তাঁকে ‘হোল ব্লাড’ দিতে নিষেধ করেছেন। কারণ এতে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকেরা জানান, ‘ব্লাড সেল সেপারেটর’ বা ‘রেফ্রিজারেটেড সেন্ট্রিফিউজার’ নামের যন্ত্র দিয়ে রক্তের লোহিত কণিকা, অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট এবং প্লাজমা আলাদা করা যায়। রক্তদাতার কাছ থেকে যে পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করা হয়, তার পুরোটা অধিকাংশ সময় একজন রোগীর প্রয়োজন হয় না। কোনো রোগীর শুধু রক্তরস, কারও রক্তকণিকা আবার কারও শুধু প্লাটিলেট প্রয়োজন হয়।
রক্তের উপাদান আলাদা করে ব্যবহার করা হলে এক ইউনিট রক্ত অন্তত তিনজন রোগীর চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে। কিন্তু উপাদান আলাদা করার যন্ত্রটি সচল থাকলেও কিটের অভাবে নির্দিষ্ট উপাদান না দিয়ে অনেক সময় রোগীকে পুরো রক্ত দিতে হচ্ছে। এতে একদিকে রক্তের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উপাদান গ্রহণের কারণে রোগীরা নতুন জটিলতায় পড়ার ঝুঁকিতে থাকছেন।
২ হাজার কিটের চাহিদাপত্র :
রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম তুষার আলম বলেন, ব্লাড সেল সেপারেটর মেশিন দিয়ে বিনামূল্যে রোগীদের সেবা দেওয়া হতো। কিন্তু কিট না থাকায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কোনো রোগীর সামর্থ্য থাকলে বাইরে থেকে কিট এনে দিলে তাঁরা সেবা দিতে পারেন। প্রতিটি কিটের দাম ১৭ হাজার ৮০০ টাকা।
তিনি জানান, ১৫ দিন আগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ২ হাজার কিটের চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কিট সরবরাহ পাওয়া যায়নি।
খুমেক হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের ল্যাব ইনচার্জ মো. রোকনুজ্জামান বলেন, রোগীর স্বজনরা চার ব্যাগ রক্তের ডোনার নিয়ে এলে ব্লাড কম্পোনেন্ট এক্সট্রাক্টরের মাধ্যমে প্লাটিলেট আলাদা করে দেওয়া হয়। এতে রোগীর খরচ পড়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে ব্লাড ব্যাগেরও সংকট রয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কয়েক দফা বিকল ও মেরামতের পর বর্তমানে মেশিনটি সচল রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় কিটের অভাবে সচল মেশিনটিও রোগীদের কোনো কাজে আসছে না। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপের এই সময়ে প্লাটিলেটের চাহিদা বাড়লেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় রক্তের উপাদান আলাদা করার সুবিধা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।



