স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় আদালতের সিল-স্বাক্ষর জাল করে ইনফরমেশন স্লিপ তৈরির অভিযোগ

# সাত জনের বিরুদ্ধে মামলা
# নামজারি বাতিল

স্টাফ রিপোর্টার ঃ খুলনার তেরখাদায় আদালতের জাল সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে ইনফরমেশন স্লিপ (তথ্যপত্র) তৈরি করে সরকারি ভূমি অফিসে দাখিলের মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ ১৬ শতক জমি নিজেদের নামে নামজারি করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাতজনের বিরুদ্ধে তেরখাদার চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করেছেন উপজেলার জয়সেনা গ্রামের এফএম হাবিবুর রহমান।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেন এফএম হাবিবুর রহমান। মামলার নথি অনুযায়ী, তিনি তেরখাদা উপজেলার জয়সেনা গ্রামের বাসিন্দা এবং তার বাবা মৃত ইয়াকুব আলী ফকির। মামলায় দ-বিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে। মামলার আরজি ও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তেরখাদা মৌজার সিএস ২৪৬ ও এসএ ৩৭২ নম্বর খতিয়ানের ৪১৪ নম্বর দাগে ১৬ শতক জমি নিয়ে বাদীপক্ষের সঙ্গে আসামিপক্ষের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে জমিটি বিএস ৬৩৯ নম্বর খতিয়ানে ১১৮৬ নম্বর দাগে ১৬ শতক হিসেবে রেকর্ড হয়। বাদীর দাবি, তার বাবা মৃত ইয়াকুব আলী ফকির ও গোলাম মোস্তফা ফকির ওই সম্পত্তির স্বত্ববান ও ভোগদখলকারী ছিলেন। মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, ওই জমির মালিকানা দাবি করে আসামিপক্ষ ১৯৯৪ সালে তেরখাদার সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করে। পরে মামলাটি খারিজ হলে জেলা জজ আদালতে আপিল করা হয়। এরপর আপিল মামলার রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন দায়ের করা হয়। বাদীপক্ষের অভিযোগ, হাইকোর্টে ওই রিভিশন মামলা চলমান থাকা এবং সংশ্লিষ্ট জারি মামলার কার্যক্রম স্থগিত থাকা অবস্থায় বিষয়টি গোপন করে আসামিরা বিরোধপূর্ণ জমি নিজেদের নামে নামজারি করার উদ্যোগ নেন। মামলার আরজিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে আদালতের জাল সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে ‘হাইকোর্ট ফরম নম্বর (এম)-৫৫’-এর আদলে একটি ইনফরমেশন স্লিপ তৈরি করেন। ওই কাগজে ২২ জুন ২০২২ তারিখ দেওয়া হয় এবং দরখাস্তকারীর নাম হিসেবে ‘আঃ সাত্তার, খুলনা জজ কোর্ট’ উল্লেখ করা হয় বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। বাদীপক্ষের অভিযোগ, ওই ইনফরমেশন স্লিপ তেরখাদা উপজেলা ভূমি অফিসে ২৪৯/২০২৬-২৭ নম্বর নামজারি মামলায় দাখিল করা হয়। পরে ওই কাগজের ভিত্তিতে বিরোধপূর্ণ ১৬ শতক জমি আসামিদের নামে নামজারি করা হয়। আদালতের সিল-স্বাক্ষর জাল করে তৈরি করা কাগজ সরকারি দপ্তরে দাখিলের মাধ্যমে ভূমি অফিসকে বিভ্রান্ত করে নামজারির আদেশ নেওয়া হয়েছে বলেও মামলার আরজিতে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিষয়টি জানতে পেরে এফএম হাবিবুর রহমান তেরখাদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর ওই নামজারি মামলার বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন। শুনানি শেষে গত ১৮ আগস্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম নুরুন্নবী নামজারি মামলাটি বাতিলের আদেশ দেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের আদেশে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগে নিম্ন আদালতের ১৪৪/১৯৯৬ নম্বর মামলার আদেশের বিরুদ্ধে জারি মামলা তথা ০২/২০০৩ নম্বর রিট দায়ের রয়েছে। বিবাদীপক্ষ বিষয়টি গোপন করে তড়িঘড়ি করে নামজারি মামলা করেছে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে নামজারি মামলায় দাখিল করা ইনফরমেশন শিটটিও তড়িঘড়িভাবে তৈরি করা হয়েছে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নামজারি মামলাটি বাতিল করা হয়।
এ বিষয়ে তেরখাদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম নুরুন্নবী বলেন, ‘নামজারি মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জমিটি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। বিষয়টি গোপন করে নামজারি করা হয়েছিল। দাখিল করা ইনফরমেশন শিটের বিষয়েও অসংগতি পাওয়া যায়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিধি অনুযায়ী নামজারি মামলাটি বাতিল করা হয়েছে।’
মামলার নথি অনুযায়ী, আসামিদের মধ্যে তেরখাদা গ্রামের সন্তোষ কুমার পাত্রের ছেলে বিকাশ কান্তি পাত্র (৫০) ও পলাশ কুমার পাত্র (৫০), তেরখাদার রঞ্জন কুমার পাত্রের ছেলে সুমন পাত্র (৪৪), খুলনা সদর থানার ইউসুফ রোড এলাকার রঞ্জন কুমার পাত্রের স্ত্রী শিখা রানী পাত্র (৪৮), তেরখাদা এলাকার সন্তোষ কুমার পাত্রের স্ত্রী প্রমীলা বালা পাত্র (৫০), সমীর কুমার সাহার স্ত্রী লিপিকা রানী পাত্র (৪৭) এবং তেরখাদা এলাকার সুরেন্দ্র নাথ সাহার ছেলে সমীর কুমার সাহা (৬০) রয়েছেন। মামলার নথিতে আরও কয়েকজনের নাম আসামি হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে, ওই নামজারি মামলার মাধ্যমে সৃজিত ২০২৬-১০০১৮১ নম্বর খতিয়ান বাতিলের জন্যও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পৃথক আবেদন করেছেন এফএম হাবিবুর রহমান। আবেদনে তিনি দাবি করেন, নিজের জমি নামজারি করতে গিয়ে নামের গরমিলের কারণে আপত্তি জানাতে গেলে জানতে পারেন, তার তফসিলভুক্ত জমি অন্যরা নামজারি করে নিয়েছেন। জাল কাগজপত্র দাখিলের মাধ্যমে দল ওই খতিয়ান সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, ঘটনার বিষয়ে মামলা করতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তেরখাদা থানায় যান বাদী। তবে থানা কর্তৃপক্ষ তাকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর আদালতে নালিশি মামলাটি দায়ের করেন তিনি।
মামলায় সাক্ষী হিসেবে সরদার আব্দুল মান্নান, জামাল বিশ্বাস, ওয়াহীদুজ্জামান টুলুসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তেরখাদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম নুরুন্নবীকেও মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে। বাদীপক্ষ অভিযোগের সত্যতা প্রমাণে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার কথা জানিয়েছে।
তবে মামলায় আনা কাগজপত্র জাল-জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত বিকাশ কান্তি পাত্র। তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র জাল-জালিয়াতির বিষয়টি সঠিক নয়। এ বিষয়ে হাইকোর্টে মামলা চলমান রয়েছে। জমিটা আমাদের বিপক্ষে যিনি ছিলেন, তার ছেলের মাধ্যমে আমরা জমিটি নিয়েছিলাম।’ মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button