যেভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে উত্থান নাসিমের

জামান ফকির : খুলনার দিঘলিয়া এলাকাটি নদীবেষ্টিত হওয়ায় খুলনা, বাগেরহাট ও নড়াইলের নদীপথের যোগাযোগ ছিল বেশ সহায়ক। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ভৌগোলিক এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আন্ডারগ্রাউন্ড চরমপন্থী রাজনীতি প্রসার লাভ করে, যার সুযোগ নেন নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম। এভাবে একপর্যায়ে হয়ে উঠেন নিষিদ্ধ পূর্ববাংলা কমিউনিষ্ট পার্টির (এম এল জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক নেতা। তিনি দিঘলিয়া উপজেলার ফরমাইশখানা এলাকার বাসিন্দা মৃত আ. গফুরের ছেলে।
এদিকে, রোববার সকালে দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকার একটি স্থানীয় চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা নাসিমকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এর মধ্য দিয়েই নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমের চরমপন্থী জীবনের যবনিকাপাত ঘটলো।
জনযুদ্ধ গ্রুপে সম্পৃক্ততা : নব্বইয়ের দশকে খুলনায় চরমপন্থী রাজনীতি যখন সংঘাতপূর্ণ রূপ নেয়, তখন নাসিম নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ) গ্রুপে যোগ দেন। এর আগে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি স্কুলে পড়া-লেখাকালীন ‘ভিলেজ পলিটিক্স’র শিকার হয়ে বিভিন্নভাবে নাজেহাল হন তিনি। এমনকি তাকে মারধরও করা হয়। মূলত সেই জিদ থেকেই তার মধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের স্পৃহা জাগে।
ক্যাডার বাহিনী গঠন : ক্ষিপ্রতা ও নিজস্ব নেটওয়ার্কের কারণে তিনি দ্রুতই জনযুদ্ধের আঞ্চলিক নেতা হিসেবে উঠে আসেন। ফরমাইশখানা, তেরখাদা ও পার্শ্ববর্তী নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোতে সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলে নিজস্ব বলয় তৈরি করেন।
আধিপত্য বিস্তার : নব্বই ও ২০০০-এর দশকে দিঘলিয়া ও আশপাশের এলাকার চিংড়ি ঘের দখল, ঘের মালিকদের ওপর চাঁদাবাজি এবং সালিশ-বিচারের নামে ভীতি প্রদর্শন ছিল তার অর্থ ও ক্যাডার শক্তির প্রধান উৎস।
নাসিমের বিরুদ্ধে যত মামলা : পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে আরো জানা যায়, নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম হলেন খুলনার নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) একজন শীর্ষস্থানীয় আঞ্চলিক নেতা। তিনি দিঘলিয়ায় বসবাস করলেও গোটা খুলনা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে চরমপন্থী কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পার্টির অন্যতম নেতা শিমুল ভুইয়ার শিষ্য ছিলেন।
নাসিমের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে ডজনখানেক মামলার তথ্য রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত পাঁচটি হত্যা মামলা, একটি অস্ত্র মামলা এবং পুলিশ অ্যাসল্ট (সরকারি কাজে বাধা/হামলা) মামলা অন্তর্ভুক্ত।
গণেশ হত্যা মামলা : ২০০২ সালে দিঘলিয়ার আলোচিত গণেশ হত্যা মামলায় জড়িত থাকার অপরাধে আদালত তাকে ৩২ বছরের কারাদ- প্রদান করেন।
একইভাবে তিনি ফুলতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ছোট কাসেম হত্যা, দিঘলিয়ার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জাহিদ হত্যা মামলা এবং বিএনপি নেতা রিয়াজ শাহেদকে হত্যাচেষ্টা মামলায় তিনি প্রধান আসামিদের একজন ছিলেন।
দীর্ঘ আত্মগোপন ও ছদ্মবেশে প্রত্যাবর্তন : ২০০২ সালে আলোচিত গণেশ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বের হয়ে তিনি এলাকা ছাড়েন। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দীর্ঘ দুই দশক (প্রায় বিশ বছর) ছদ্মবেশে আত্মগোপনে ছিলেন।
স্থানীয় রাজনীতিতে পুনর্বাসন : দীর্ঘ সময় পর ২০২৩-২০২৪ সালের দিকে তিনি এলাকায় ফেরেন। এলাকায় ফিরে নিজের অবস্থান মজবুত করতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট বলেও পরিচিতি লাভ করেন।
গ্রেপ্তার ও পুলিশ থেকে ছিনতাইয়ের নাটকীয় ঘটনা : ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে প্রথম দফায় গ্রেপ্তার করে, তবে কিছুদিন পরই তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন। ২০২৫ সালের ১৮ জুন রাতে দিঘলিয়া থানা পুলিশ তাকে আবার গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় তার অনুসারী চরমপন্থী ক্যাডাররা পুলিশের ওপর হামলা চালায় এবং তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলার পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। এ ঘটনার ৪ দিন পর ২২ জুন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আবারও অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে জেলে পাঠায়। দীর্ঘ কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ফরমাইশখানা এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
সব শেষ পরিণতি :
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নাসিম রোববার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে পৌনে ১২ টা পর্যন্ত ফরমাইশখানা এলাকার তার বাড়ির পাশে স্থানীয় তৈয়ব আলীর চায়ের দোকানে বসেছিলেন। তখন ভ্যানযোগে আসা দুজন সন্ত্রাসী তাকে লক্ষ্যকরে একাধিক গুলি চালায়। এরপর তারা বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তিনটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হয়। দ্রুত তাকে খুমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।



