স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় চরমপন্থি নেতা নাসিমকে গুলি করে হত্যা

স্টাফ রিপোর্টার : পূর্ববাংলা কমিউনিষ্ট পার্টির (এম এল-জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক নেতা হত্যাসহ একডজন মামলার আসামি নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমকে (৫৫) গুলি করে হত্যা হয়েছে। রোববার দুপুরে জেলার দিঘলিয়া উপজেলার ফরমাইশখানা এলাকায় তাকে গুলি করা হয়। তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত্যু ঘোষণা করেন। নাসিম দিঘলিয়া উপজেলার ফরমাইশখানা এলাকার বাসিন্দা মৃত আ. গফুরের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নাসিম সকাল সাড়ে ১১টা থেকে পৌনে ১২ টা পর্যন্ত ফরমাইশখানা এলাকার স্থানীয় তৈয়বের চায়ের দোকানে বসেছিলেন। তখন ভ্যানযোগে আসা দুজন সন্ত্রাসী তাকে লক্ষ্যকরে একাধিক গুলি চালায়। এরপর তারা বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তিনটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হয়।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দিঘলিয়া থানার অফিসার্স ইনচার্জ হাওলাদার সানওয়ার হোসাইন মাসুম বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিন রাউন্ড তাজা গুলি ও তিন রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
ওই সময় দোকানে বসাছিলেন দিঘলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মোল্লা হারুনুর রশিদ। তিনি জানান, নাসিম একটা বনরুটি, একটি কলা খাওয়ার পর চা পান করেছিলেন। এসময়ে লুঙ্গিপড়া দুজন যুবক ভ্যান থেকে নেমে গুলি করতে করতে চা ষ্টলে প্রবেশ করে। এরপর তারা নাসিমের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি করে।
তিনি আরো বলেন, আমিও তখন পাশে বসে চা খাচ্ছিলাম এবং তার সাথে কথা বলছিলাম। গুলি করার পরপর আমি একজনকে জাপটে ধরি। তখন অপরজন আমার দিকে অস্ত্র উচুঁয়ে ধরলে ছেড়ে দেই। ঘটনার পর যে ভ্যান যোগে ওই দুই কিলার এসেছিল সেই ভ্যানে চড়েই তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তাদের একজনের বয়স ২৫ এবং াপরজনের ৩০ বছর হবে।
নিহত নাসিমের স্ত্রী মুক্তা বলেন, পর পর তিন রাউন্ড গুলির শব্দ মোনার পর আমি তৃতীয়তলা থেকে নীচে নেমে এসে দেখি নাসিমের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। এরপর তাকে ধরাধরি করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসি। তিনি জানান, তাদের বড় মেয়ে মিম (১৯) বেসরকারী ড্যাফোডিল বিশ^বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। মাহিন (৭) নামের আরো একজন ছেলে রয়েছে।
নাসিমের গরুর ফার্মের ম্যানেজার রনি বলেন, আমি ফার্মেই ছিলাম। গুলির শব্দ শুনে এসে দেখি নাসিম পড়ে আছে। কিলিং মিশনে দুজন ছিল বলে সে জানায়।
দিঘলিয়া থানার অফিসার্স ইনচার্জ হাওলাদার সানওয়ার হোসাইন মাসুম বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিন রাউন্ড তাজা গুলি ও তিন রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে হত্যাকান্ডের পর ছায়া তদন্ত শুরু করেছে এসআরবি’সহ বিভিন্ন সংস্থা। জানতে চাইলে এসআরবি’র -৬ কর্মকর্তা মেজর নাজুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসি ফুটেজের ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে। আশাকরি খুনীরা ধরা পড়বে।
পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম খুলনার নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) শীর্ষস্থানীয় আঞ্চলিক নেতা। তিনি দিঘলিয়া ও খুলনা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে চরমপন্থী কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ডাকাতি এবং অস্ত্র কেনাবেচাসহ প্রায় এক ডজন মামলা রয়েছে। এর মধ্যে আলোচিত গণেশ হত্যা মামলায় তার ৩২ বছরের কারাদ- এবং একটি অস্ত্র মামলায় ১৭ বছরের কারাদ-ের আদেশ রয়েছে। এছাড়াও তিনি বিএনপি নেতা রিয়াজ শাহেদ হত্যা চেষ্টা এবং জাহিদ চেয়ারম্যান হত্যা মামলারও আসামি।
২০০২ সালে গণেশ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি আদালত থেকে জামিন নিয়ে আত্মগোপন করেন। এরপর টানা ২১ বছর ধরে বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছদ্মবেশে পলাতক ছিলেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে পুলিশ প্রথম দফায় গ্রেপ্তার করে। পরে জামিনে বের হলে ২০২৫ সালের ১৮ জুন রাতে দিঘলিয়া থানা পুলিশ তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে। তবে থানায় নিয়ে যাওয়ার পথে তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে এবং ঘটনার ৪ দিনের মাথায় ২২ জুন খুলনার খালিশপুরের মুজগুন্নি পার্ক এলাকার একটি ভবন থেকে গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে সে আবারও জামিনে মুক্তি পায়।
নাসিমের বিরুদ্ধে হুজি শহীদ, মুন্না, ইকবাল হুজুর, ফকিরহাটের জাহিদ চেয়ারম্যান হত্যাসহ এক ডজনের বেশি মামলা রয়েছে।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, নিহত নাসিমের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ৭টি মামলার রেকর্ড পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ৫টি হত্যা মামলা, একটি অস্ত্র ও একটি মারামারি মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরো মামলা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ময়না তদন্তের পর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে লাশ হস্তান্তর করা হবে বলে জানান এসপি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button