খুনের নগরী ‘খুলনা’ : নিরাপত্তা চেয়েও রক্ষা নেই

চলছে রক্তের হোলিখেলা
অপরাধী গ্রুপের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ
কামরুল হোসেন মনি : থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও শেষ রক্ষা হয়নি রূপসার বাস শ্রমিক আক্তার ঢালীর। ছেলেকে হত্যার ঘটনায় মামলা করার পর হুমকি পেয়ে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জিডি করার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় নিজ বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। এর আগে একই এলাকায় তার ছেলে জয় ঢালীও হত্যাকা-ের শিকার হন। শুধু বাবা-ছেলে হত্যাকা-ই নয়, খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুলি, টার্গেট কিলিং ও হত্যাকা-ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ৩৩ মাসে খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) আট থানায় ৯৬টি হত্যাকা- ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৯৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৭টি এবং চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৩০টি হত্যাকা- ঘটেছে।
পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নগরীতে প্রতি মাসেই একাধিক হত্যাকা- ঘটেছে। জানুয়ারিতে একটি, ফেব্রুয়ারিতে চারটি, মার্চে চারটি, এপ্রিলে দুটি, মে মাসে তিনটি, জুনে তিনটি, জুলাইয়ে তিনটি, আগস্টে পাঁচটি এবং সেপ্টেম্বরে পাঁচটি হত্যাকা- ঘটে।
গুলিতে ও টার্গেট কিলিংয়ে বাড়ছে উদ্বেগ :
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে গুলির ব্যবহারও চোখে পড়ার মতো। গত ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ার ফরমাইশখানায় পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল করিম ওরফে নাসিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে টার্গেট কিলিং বলে ধারণা করছে। এর পরদিন ৫ অক্টোবর রূপসায় ছেলে হত্যার মামলার বাদী আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তার আগে হুমকি পাওয়ার পর থানায় জিডি করেছিলেন তিনি। ফলে নিরাপত্তা চেয়েও হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই ৭ অক্টোবর ভোরে নগরীর দৌলতপুর থানার বিএল কলেজের দ্বিতীয় গেট এলাকায় মহিদুল ইসলাম (২২) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
খুলনা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আনিসুজ্জামান বলেন, জয় ঢালীর স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের বিরোধের জেরে তিনি নিহত হন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আক্তার ঢালী বাদী হয়ে মামলা করেন এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ৬ অক্টোবর আক্তার ঢালী হত্যাকা-ে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যার আগে হুমকি পেয়ে আক্তার ঢালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন এবং বিষয়টি পুলিশ ফাঁড়িকেও জানানো হয়েছিল। গত দেড় মাসে বাবা-ছেলে হত্যার বেশির ভাগ ঘটনায় পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও হুমকির বিষয় সামনে এসেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা জেলার ৯ থানায় ৩৩টি হত্যাকা- ঘটেছে।
তিন বছরে খুনের চিত্র :
কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মহানগরীর আট থানায় ২৯টি হত্যাকা- ঘটে। পরের বছর ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭-এ। আর চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ৩০টি হত্যাকা- হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪ ও ২০২৫ সালের দুই বছরের ৬৬টি হত্যাকা-ের পর চলতি বছরের নয় মাসেই আরও ৩০টি হত্যাকা- ঘটেছে। সব মিলিয়ে ৩৩ মাসে হত্যাকা-ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৬টি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা সদর থানায় ছয়টি, সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় দুটি, লবণচরা থানায় ছয়টি, হরিণটানা থানায় তিনটি, খালিশপুরে তিনটি, দৌলতপুরে চারটি, আড়ংঘাটায় চারটি এবং খানজাহান আলী থানায় দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। কেএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) গোলাম মোহাম্মদ বলেন, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যাকা-ের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধের নেপথ্যে মাদক-আধিপত্য :
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য বলছে, নগরীর অপরাধজগতে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখল, আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্রের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে এসব গ্রুপের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। সেই বিরোধের জের ধরে সংঘর্ষ ও হত্যাকা-ের ঘটনাও ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় নগরীর আলোচিত অপরাধী গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বি-কোম্পানি’, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, বেজি আল-আমিন, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ। ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, “সন্ত্রাসী যেই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।” তার দাবি, বেশির ভাগ হত্যাকা-ের পেছনে মাদককে কেন্দ্র করে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসছে। মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে পুলিশ।
কিশোরদের ব্যবহার করছে অপরাধী গ্রুপ :
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে সক্রিয় অপরাধী গ্রুপগুলোর সঙ্গে কিশোরদের সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে শুরু হয়ে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখল ও অস্ত্রের ব্যবহারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অনেক তরুণ। কেএমপির বিশেষ শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোনো কিশোর গ্যাংয়ের কিশোর নেতৃত্ব দিচ্ছেÑএমন কাউকে শনাক্ত করা না গেলেও নগরীর বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে কিশোরদের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যরা কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকা- পরিচালনা করছে।
প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে :
নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করার পরও আক্তার ঢালীর হত্যাকা- এবং সাম্প্রতিক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে হুমকি পাওয়ার পর থানায় লিখিত অভিযোগ করেও একজন ব্যক্তি হত্যার শিকার হওয়ায় নিরাপত্তা চাওয়ার পর পুলিশের পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিলÑসে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অপরাধী গ্রুপগুলোর তৎপরতা এখন মাঠপর্যায়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন পেজ ও আইডিতে দলবদ্ধ ছবি, হুমকির বার্তা, নির্যাতনের ভিডিও ও নানা ঘোষণা প্রচার করা হচ্ছে। ‘বি-কোম্পানি’ পরিচয়ে পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজ এবং নূর আজিমও জামিনে মুক্ত হওয়ার পর ফেসবুকে সক্রিয়তার জানান দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, মানুষের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় বেড়েছে। পাশাপাশি সংস্কৃতির পরিবর্তনও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির একটি কারণ। তার মতে, আকাশ সংস্কৃতি, ইন্টারনেট ও মোবাইল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে মানুষের জীবনধারা ও চিন্তাভাবনায় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাবে অল্প বয়সেই বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে সমাজে অস্থিরতা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।
অন্যদিকে চলতি বছরের নয় মাসেই ৩০টি হত্যাকা-ের ঘটনা নগরীর অপরাধ পরিস্থিতির ওপর নতুন করে আলো ফেলেছে। গুলি, মাদক, আধিপত্য ও পারিবারিক বিরোধÑবিভিন্ন কারণে হত্যাকা- ঘটলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় পেশাদার সন্ত্রাসী বা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। ফলে ৩৩ মাসে ৯৬ হত্যাকা-ের পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি খুলনা মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, মাদককেন্দ্রিক সংঘাত এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।



