স্থানীয় সংবাদ

খুলনাঞ্চলে এবার সাড়ে ৮ লাখ মেঃ টন ‘চাল’ উৎপাদনের সম্ভবনা

# অর্থবছর ২০২৬-২০২৭’র রোপা আমন আবাদ ও কর্তন #
# অঞ্চলে চুড়ান্ত আবাদ শতভাগ সম্পন্ন, আবাদের চুড়ান্ত হার ১০০.১%
# উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে প্রদত্ত প্রণোদনা, বাড়তি উৎপাদন ১৫১ হেক্টর
# সংশ্লিষ্টরা বলছেন : উৎপাদিত চাল দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে অগ্রনী ভূমিকা রাখবে

মোঃ আশিকুর রহমান : চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে খুলনাঞ্চলে রোপা আমন ধানের আবাদ ও সম্ভাব্য উৎপাদনের চুড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে, যার হার ১০০.১% এবং অঞ্চলের সম্ভাব্য চালের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৪ মেট্রিক টন। আমন আবাদের চুড়ান্ত অর্জন শেষে অঞ্চলে শুরু হয়েছে রোপা আমন কর্তনের কার্যক্রম, অঞ্চলে রোপা আমন কর্তনের হার প্রায় ২%, অর্থ্যাৎ, শুরু হচ্ছে কর্তনের কর্মযজ্ঞ। অঞ্চলে চলতি অর্থবছরের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরনের জন্য কৃষকের দিনজুড়ে কঠোর পরিশ্রমের ফলে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরন সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলাগুলোতে রোপা আমনের ক্ষেতে এখন উঁকি দিচ্ছে সোনালী ফসল। কৃষকেরা এখন ব্যস্ত ও চিন্তিত বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগের কবলে পড়ে ঘাম ঝরানো ফসল ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেই ফসল ঘরে তোলার পরিকল্পনা ও কার্যক্রম নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে রোপা আমন আবাদ ও সম্ভাব্য উৎপাদন শতভাগ পূরণ করে খুলনাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখার পাশাপাশি এই অঞ্চলের খাদ্য ঘাটতি ও চাহিদা পূরণেও অগ্রনী ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদী।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চলের সর্বশেষ তথ্য সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে খুলনাঞ্চলে রোপা আমন আবাদের (হাইব্রীড, উফশী ও স্থানীয় জাত) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয় ২ লাখ ৮৯ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমি। গৃহিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে খুলনাঞ্চলের চুড়ান্ত আবাদ ও সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার চুড়ান্ত রুপ ২ লাখ ৯০ হাজার ১০ হেক্টর জমি। এবার অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রা হতে ১৫১ হেক্টর জমিতে বাড়তি চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে। যার মধ্যে খুলনা জেলার লক্ষ্যামাত্রা ছিল ৮৮ হাজার ৩৫১ হেক্টর, বিপরীতে চুড়ান্ত আবাদ সম্পন্ন হয়েছে ৮৭ হাজার ৪৬৯ হেক্টর, হার ৯৯%, বাগেরহাট জেলার লক্ষ্যামাত্রা ছিল ৬৮ হাজার ৮৯৩ হেক্টর, বিপরীতে চুড়ান্ত আবাদ সম্পন্ন হয়েছে ৬৮ হাজার ৭০৬ হেক্টর, হার ৯৯.৭% , সাতক্ষীরা জেলার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৯ হাজার ১৫০ হেক্টর, বিপরীতে চুড়ান্ত আবাদ সম্পন্ন হয়েছে ৯০ হাজার ১৬০ হেক্টর, হার ১০১.১% ও নড়াইল জেলার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৩ হাজার ৪৬৫ হেক্টর, বিপরীতে চুড়ান্ত আবাদ সম্পন্ন হয়েছে ৪৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর, হার ১০০.৫%। খুলনাঞ্চলে চুড়ান্ত আবাদের হার ১০০.১%।
চলতি অর্থবছরে অঞ্চলের চুড়ান্ত আবাদের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জনের বিপরীতে অঞ্চলের সম্ভাব্য চালের উৎপাদন ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৪ মেট্রিক টন। যার মধ্যে খুলনা জেলার সম্ভব্য চালের উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ২০৫ মেট্রিক টন, বাগেরহাট জেলার সম্ভব্য চালের উৎপাদন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন, সাতক্ষীরা জেলার সম্ভব্য চালের উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫৩ মেট্রিক টন ও নড়াইল জেলার সম্ভব্য চালের উৎপাদন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯১ মেট্রিক টন চালের। বলা বাহুল্য, চলতি অর্থবছরে খুলনাঞ্চলে রোপা আমন আবাদকে আরও গতিশীল করে তুলতে ৪৪ হাজার কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হয়। প্রণোদনার উপকরণ হিসাবে কৃষককে ২২০ মেট্রিক টন উফশী আমন জাতের বীজ, ৪৪০ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ৪৪০ মেট্রিক টন এমওপি সার প্রদান করেন সংশ্লিষ্টরা। যার দরুন প্রণোদনা পেয়ে কৃষকেরা চাষাবাদে অধীক আগ্রহী হওয়ার দরুন আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চুড়ান্ত পর্যায়ে ১৫১ হেক্টর জমিতে বেশি চাষাবাদ হয়েছে, যা মাইল ফলক হিসাবে রুপ দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ দেখা না দিলে চলতি অর্থবছরে রোপা আমন আবাদের খুলনাঞ্চলে সম্ভব্য উৎপাদিত চাল একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখবে, অন্যদিকে এই অঞ্চলের খাদ্য ঘাটতি ও চাহিদা পূরণেও অগ্রনী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, প্রায় আড়াই একর জমিতে আমন ধানের চাষাবাদ করছি। প্রণোদনা হিসাবে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে উন্নত উফশী আমন জাতের বীজ ও সার দিয়েছিল, ফলন ভালো হয়েছে। এখন পোকামাড়ক যেন ফসলের ক্ষতি না করতে পারে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখছি। এছাড়া সার্বক্ষনিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ ও সহয়তা প্রদান করছেন।
কৃষক শাহিন জানান, আমন আবাদ খুব ভালো হয়েছে। ১০/১৫ দিন পর থেকে ক্ষেতের ফলস কাটা ধরবো। কৃষি অফিস থেকে প্রণোদনা হিসাবে সার ও বীজ দিয়েছিল। চাষাবাদে এই উপকরণ আমাদের দারুন ভাবে উপকৃত করেছে। এখন একটাই চিন্তা দ্রুত ফলস ঘরে তোলা। কৃষি অফিস থেকে ধান লাগানো থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সকল বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছে।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি অফিসের অর্ন্তগত হালিয়া ব্লকের দায়িত্বরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম জানান, চলতি অর্থবছরে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৭৫০ হেক্টর জমি থাকলেও, চুড়ান্ত অর্জনে আরও ৩৫ হেক্টর জমিতে বেশি চাষাবাদ হয়েছে। কৃষকদের প্রণোদনা প্রদানের দরুন তারা চাষাবাদে অধিক আগ্রহী হওয়ার দরুন, লক্ষ্যমাত্রা তুলনায় বেশি চাষবাদ হয়েছে। বর্তমানে ফসলকে পোকা-মাকড়ের দমন ও নিপিড়ন হতে রক্ষার জন্য ক্ষেতে আলোক ফাঁদ ব্যবহারের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়াসহ সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বরত উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আমিরুল ইসলাম জানান, আবাদের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরে ৪৫ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে সার ও বীজ প্রদান করা হয়েছে, যে কারনে তারা চাষাবাদে আগ্রহী হয়েছেন। বর্তমানে ফসলকে পোকা-মাকড়ের দমন ও নিপিড়ন হতে রক্ষার জন্য ক্ষেতে আলোক ফাঁদ ব্যবহারের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়াসহ সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, চলতি উৎপাদন বছরে উপজেলার রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল ১,৮২৭ হেক্টর। যা ইতোমধ্যে শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলার কৃষকদের প্রণোদনা সহয়তার এ লক্ষ্যমাত্রা পূরনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে। তবে উপজেলার নি¤œঅঞ্চল গুলিতে জলাবদ্ধতা থাকার দরুন আমন আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। আশা করা যাচ্ছে আগামী ১৫/২০ দিন পর থেকে পুরাদমে কর্তন শুরু হবে। যে সকল এলাকায় কারেন্ট পোকার আক্রমন বেশি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে, ওইসব এলাকা ও বাজারগুলোতে ভ্রাম্যমান কৃষি পরামর্শ কেন্দ্রের মাধ্যমে পরামর্শ প্রদান করছি। জনসচেনতার জন্য লিফলেট বিতরন করছি।
নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার কৃষি অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চলতি উৎপাদন বছরে উপজেলার রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল ১২,০৬০ হেক্টর, অর্জিত হয়েছে ১২,০৬২ হেক্টর জমি। চলতি অর্থবছরের আওতায় রোপা আমন আবাদে ১৬৬০ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে সার ও বীজ সহায়তা করার দরুন তারা চাষাবাদে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। যা উপজেলার রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে। ইতোমধ্যে ধানের কর্তন শুরু হয়েছে, প্রাকৃতিক দূর্যোগে পড়ে যেন কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ না হন, দ্রুত ফসল ঘরে তুলছে সার্বিক পরামর্শ ও সহয়তা করা হচ্ছে। এছাড়া যে সকল কৃষক লেট ভ্যারাইটি করেছেন তাদের ক্ষেতের ফসলকে পোকা-মাকড়ের আক্রমন হতে সুরক্ষিত রাখতে ক্ষেতে আলোক ফাঁদ ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দেওয়াসহ সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার প্লাবনী সরকার জানান, চলতি উৎপাদন বছরে জেলা কর্তৃক উপজেলার রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়ে ১৭,৫৮৫ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চুড়ান্ত অর্জন হয়েছে ১৭,৮৩৫ হেক্টর জমি। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাড়তি চাষাবাদ হয়েছে ২৫০ হেক্টর। চলতি অর্থবছরের আওতায় রোপা আমন আবাদে কৃষককে প্রণোদনা সহয়তা দরুন তারা চাষাবাদে বেশি আগ্রহী হন। যা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ বাড়তি চাষাবাদে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি উপজেলায় খাল খননেও জলাবদ্ধতা দূর হওয়ার দরুন চাষাবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। যে সকল কৃষকেরা আগাম আমন চাষ করেছিল, তারা ইতোমধ্যে ফসল কর্তন শুরু করেছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগে পড়ে যেন কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ না হন, দ্রুত ফসল ঘরে তুলছে সার্বিক পরামর্শ ও সহয়তা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাগেরহাট জেলার উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন জানান, চলতি উৎপাদন বছরে বাগেরহাট জেলায় রোপা আমনের চুড়ান্ত আবাদ হয়েছে ৬৮,৭০৬ হেক্টর জমি, হার ৯৯.৭%। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চুড়ান্ত আবাদে ১৮৭ হেক্টর উৎপাদন বা চাষাবাদ কম হয়েছে। এর কারন, জেলার কিছু জায়গায় জলাবদ্ধতার দরুন কৃষকেরা আমন আবাদে অনাগ্রহ প্রকাশ করে, বিপরীতে তারা আগাম রবি করবে। রবি মৌসুমে এ ঘটতি পূরন হয়ে যাবে। তিনি আরও জানান, উপরোক্ত উৎপাদন ঘাটতিতে জেলায় কোনো প্রকার খাদ্যের উৎপাদন ঘাটতি দেখা দেবে না। অর্থ্যাৎ, রোপা আমন আবাদে কিছু উৎপাদন কম হলেও, রবি মৌসুমে এ ঘাটতি সম্পন্ন হয়ে যাবে। তাছাড়া চলতি বছরে অতি বৃষ্টির কারণে নিমাঞ্চল তলিয়ে যায়, যে কারনে জেলার কৃষকেরা বাজারে সবজির ভালো দাম পাওয়ার দরুন রোপা আমন চাষাবাদের পাশাপাশি সবজি নিয়েও তারা ব্যস্ত ছিল। আশাকরি এই জেলার উৎপাদিত চাল অঞ্চলের খাদ্য চাহিদা পূরনে অগ্রনী ভূমিকা রাখবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি অর্থবছরে খুলনাঞ্চলে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে, বাড়তি চাষাবাদ হয়েছে ১৫১ হেক্টর জমিতে, শুরু হয়েছে কর্তন। আমন আবাদকে আরও গতিশীল করতে প্রণোদনা হিসাবে কৃষকদের যে সহয়তা করা হয়েছিল, ওই কারনে অঞ্চলে আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। আশাবাদী, অঞ্চলের সম্ভব্য উৎপাদিত খাদ্যে (চাল) ও আয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কৃষকদেরও আর্থিকভাবে লাভবান ও আত্মনির্ভর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button