স্থানীয় সংবাদ

গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ৭ দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ আজ

৪২০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাজনৈতিক সফর ও পথসভা
লংমার্চ ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তাপ

স্টাফ রিপোর্টার : গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি পুরোপুরি বন্ধসহ ৭ দফা দাবিতে আজ ৩১ অক্টোবর (শনিবার) ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে তৃতীয় দফা লংমার্চের ডাক দিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য। প্রায় ৪২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাজনৈতিক সফর ও পথসভাকে কেন্দ্র করে খুলনাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ১ হাজার যানবাহনের বিশাল বহর নিয়ে আয়োজিত এই কর্মসূচির খুলনা অংশে জনসমুদ্রের প্রত্যাশা করছেন আয়োজকেরা। বিশেষ করে খুলনা মহানগরীর শিববাড়ি মোড় ও ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডের পথসভায় দেড় অর্ধলক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ ঘটবে বলে আশা করছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা। ইতিম্রধ্যই প্রচার-প্রচারণা, তোরণ নির্মাণ ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের মধ্য দিয়ে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে শুক্রবার বিকেলে শিববাড়ী মোড়ের পথসভার মঞ্চ পরিদর্শন এবং সর্বশেষ প্রস্তুতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটি খুলনার আহবায়ক ও মহানগরী জামায়াতের আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, লংমার্চের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এই পথসভা আমাদের গণদাবি আদায়ের আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।
তিনি বলেন, খুলনার সাধারণ মানুষ সব সময়ই অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শনিবারের লংমার্চ ও ঐতিহাসিক বাবরী চত্বরের পথসভাকে শান্তিপূর্ণ ও স্মরণকালের অন্যতম সর্ববৃহৎ মহাসমাবেশে পরিণত করতে আমরা সর্বস্তরের নগরীবাসীর সার্বিক সহযোগিতা ও উপস্থিত কামনা করছি। এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল সহকারী পরিচালক মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের খুলনা মহানগরী সভাপতি মুফতি শরীফ সাইদুর রহমান, জেলা সেক্রেটারি শহীদুল ইসলাম, এনসিপির মহানগরীর সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদ আহমেদ পাঠান, জাগপার মহানগর সভাপতি মো. রাশেদ খান, বিডিপির মহানগর সভাপতি এডভোকেট হানিফ উদ্দিন, লেবার পার্টির সাধারণ সম্পাদক সোহেল হাওলাদার, এবি পার্টির মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, জাগপার মহানগর সেক্রেটারি ইয়াসিন আরাফাত, জাগপার আবির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
১১ দলীয় ঐক্যের সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল ৭টায় ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চ কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ৮টায় গাড়িবহর যাত্রা করবে। পদ্মা সেতু, ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ ও বাগেরহাটের কাটাখালী হয়ে বহর খুলনায় পৌঁছাবে। এরপর ফুলতলা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে পথসভা করে কুষ্টিয়ায় সমাপনী সমাবেশের মধ্যদিয়ে লংমার্চ শেষ হবে।
আয়োজকদের দেওয়া সূচি অনুযায়ী, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাগেরহাটের কাটাখালী মোড়ে পথসভা হবে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খুলনা মহানগরীর শিববাড়ি মোড়ে এবং সোয়া ২টার দিকে ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডে পথসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে শিববাড়িতে বেলা ১১টা থেকেই বক্তৃতা শুরু হবে। পরে যশোরের মুরলী মোড় ও চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে পথসভা শেষে কুষ্টিয়া আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া বক্তব্য রাখবেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্ণেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর শাইখুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন।
এদিকে, খুলনায় পথসভা সফল করতে ১৭টি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। মঞ্চ নির্মাণ বিভাগ, সাউন্ড বিভাগ, নিরাপত্তা বিভাগ, শৃঙ্খলা বিভাগ, মেহমান বিভাগ, পরিবহন বিভাগ, ডেকোরেশন বিভাগ, প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ, অফিস বিভাগ, মিডিয়া বিভাগ, আইটি বিভাগ, তথ্য বিভাগ, সাস্থ্য ও চিকিৎসা বিভাগ, অর্থ বিভাগ, পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয় বিভাগসহ ১৭টি উপ-কমিটির প্রস্তুতির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। এসব কমিটির সদস্যরা প্রতিদিনই বৈঠক করছেন। লংমার্চ ও পথসভা সফল করতে অর্ধ লক্ষাধিক পোস্টার, তিন লক্ষাধিক লিফলেট, দুই সহস্রাধিক ফেস্টুন, সহস্রাধিক প্লাকার্ড, শতাধিক বিলবোর্ড, পাঁচ শতাধিক ব্যানার, শতাধিক ড্রপ ডাউন, সহস্রাধিক জাতীয় পতাকা তৈরি করা হয়েছে। আর নেতৃবৃন্দদেরকে স্বাগত জানিয়ে রূপসার কুদির বটতলা, রূপসা সেতু, জিরোপয়েন্ট, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, গল্লামারী, ময়লাপোতা মোড়, জোড়াগেট, বৈকালী মোড়, নতুন রাস্তা মোড়, দৌলতপুর, ফুলবাড়িগেট, শিরোমনি, অফিলগেট, পথেরবাজার, ফুলতলা থানা সামনেসহ মোট ২০টি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। বাবরী চত্বর থেকে সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, বাবরী চত্বর থেকে ময়লাপোতা হয়ে সোনাপোতা স্কুল, বাবরী চত্বর থেকে নিউমার্কেট, বাবরী চত্বর থেকে পাওয়ার হাউস মোড় পর্যন্ত বিস্তৃতি দুই শতাধিক হর্ণ। ফলে গোটা নগরী হবে লংমার্চের পথসভার স্থান। শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবেন ১ হাজার ২৬৬ জন স্বেচ্ছাসেবক। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ২০টি বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া পোস্টার, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন, ব্যানার ও প্লাকার্ড ঝুলানো হয়েছে। বাবরী চত্বরে (শিববাড়ি) মোড়ের ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থের মঞ্চ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। সমাবেশে বক্তব্য শোনানোর জন্য দুই শতাধিক হর্নসহ প্রয়োজনীয় শব্দ পরিবর্ধক সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানান আয়োজকেরা।
লংমার্চের গাড়িবহরের সম্মুখভাগ শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান করবে এবং বহরের শেষাংশ কেডিএ এভিনিউ ও ময়লাপোতা হয়ে নিরালার দিকে থাকবে। গাড়িগুলো সড়কের বাম পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা গাড়িতে থেকেই বক্তব্য শুনবেন এবং দুপুরের খাবার ও যোহরের নামাজ আদায় করবেন।
যানবাহন রাখার জন্য জোড়াগেট সিএন্ডবি কলোনির মাঠ, সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল ও ময়ূরী আবাসিক এলাকায় তিনটি পার্কিং স্পট নির্ধারণ করা হয়েছে। যানজট এড়াতে স্বেচ্ছাসেবকেরা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
অপরদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল এবং ফুলতলার স্বাধীনতা চত্বরের পথসভা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বেলা ১১টায় ফুলতলা উপজেলা জামায়াত কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বর্তমানে খুলনাসহ সারাদেশে হত্যা, গুলি, মারামারি, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি এবং দখলবাজি-চাঁদাবাজীর মতো বিভিন্ন অপকর্মে সরকারি দল সরাসরি জড়িত রয়েছে।
খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন লংমার্চের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংষ্কারে জাতির আকাঙ্খা পূরণের পথ উন্মোচন হয়। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর সর্বপ্রথম তারা গণভোটের গণরায় না মেনে জাতির সাথে প্রতারণা করে। পাশাপাশি খুলনাসহ দেশব্যাপী হত্যা, সন্ত্রাস, খুন ও চাঁদাবাজীতে আজ দেশবাসী আতঙ্কিত। জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট ও মূল্য বৃদ্ধিতে দেশবাসীর মধ্যে আজ তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দেশের দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে সরকারের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে ১১ দলীয় ঐক্য লংমার্চের মাধ্যমে জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে এই লংমার্চ। খুলনায় হত্যা, গোলাগুলি এখন নিত্যদিনে পরিণত হয়েছে। নাটোরের এমপি’র ছেলে কর্তৃক নিজ দলের কর্মীকে হত্যায় গোটা জাতি আজ হতবাক। সিটি কর্পোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জেলা পরিষদসহ সব জায়গায় দলীয়করণেরও প্রতিবাদ জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button